হায়না তো চায়নায়ে মশাই ১৫ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (৪) · জুন ২০১৯

আমাদের যেমন অফিসটাইমের লিফটে ওঠানামার সময়ে, অথবা লোকাল ট্রেনে চাপতে, যথাযথ লাইন বা নজরদারের কঠোর শাসন না থাকলে, চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, পরে গালিগালাজ আর একদম শেষে হাতাহাতি ছাড়া আর কিছু আশা করা অনুচিত, তেমনই বিলেতে কিন্তু বাচ্চা থেকে বড়, সকলে প্রকাশ্যে কেমন সুন্দর সংযম দেখায় সব কিছুতেই। কোথাও তেমনভাবে কোনরকমের লম্বা লাইন বা বাড়তি নিয়ন্ত্রণ কিছু নেই। সবাই কেমন নিজের অজ্ঞাতেই মেনে চলেছেন একটা অকথিত নিয়মানুগ অভ্যাস। তাছাড়া, কথাতেই তো আছে, বিলিতি ভদ্রতা!

অন্যদিকে, গত দুদিনেই, কথায়ে-কথায়ে, প্লিজ, মে আই, থ্যাঙ্ক ইয়উ, ইয়উ’র ওয়েল্কাম, এক্সকিউজ মি আর পার্ডন মি শুনে শুনে আমাদের ছোটোকন্যা কিন্তু আর কাউকে সামনে না পেয়ে, তার বাপ-মা আর দিদির সাথেই শুরু করে দিয়েছে একটা অদ্ভুত শালীন ভদ্র ব্যবহার। মুখে সে চব্বিশঘণ্টাই ঝুলিয়ে রেখেছে একটা অমায়িক হাসি আর সাথে সাথেই তার বাচনভঙ্গী বা ইংরিজি উচ্চারণ, দুটো বাস্তবিকই সাহেবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাতে আর কিছু না হলেও, বকবকানিটা কমে গিয়েছে একদম। হাঁটতে চলতে এলোপাথাড়ি হুড়ুমদুড়ুম পা ফেলা নেই, উল্টোপাল্টা জায়গাতে ধুপ করে বসে পরা নেই, যেন তার গোটা শরীর থেকেই অগোছালো ব্যাপারটা উবে গিয়েছে ম্যাজিকের মতন।

বিলেতে একটা রাত কাটিয়েই বুঝে নিয়েছে, ভয়ঙ্কর রকমের বিরক্ত লাগলেও, এই দেশটাতে বুঝি বিরক্তি প্রকাশ করা নিষেধ। ন্যাশানাল গ্যালারীর সাময়িক বিশ্রামের পরেও, প্রত্যেকের পা দুটি কিন্তু তখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। আমরা সক্কলে যারপরনাই বিরক্ত। ব্যাথায়ে আর ক্লান্তিতে, কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যাচ্ছে একে অপরের সাথে। তবে ছোটজন কিন্তু তারই মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ও শিষ্টাচার বজায় রেখেছে অনবরত। পা ব্যাথার খবর জানতে চাইলেই জবাব আসছে, “ইটস ওকে বাবু.. নো ওয়ারিজ, আই ক্যান ভেরি ওয়েল ম্যানেজ”। তাছাড়া তার কাঁধে একটা বড়সড় ব্যাগ, তাতে ছাতা, জলের বোতল, জরুরি ওষুধপত্তর, সাংসারিক টুকিটাকি আরও কতকি! সে সব ঝামেলা বয়েও মেয়ের আমার কোনো প্রকার বিরক্তির চিহ্ন নেই মুখে। বিলিতি ভদ্রতায় নিখুঁতভাবে সে সামলে চলেছে সব অপ্রতুলতা।

অবশ্য সে ভদ্রতা দেখা গেল ক্ষণস্থায়ী। ট্র্যাফালগার স্কোয়্যারে পৌঁছেই মানুষের বদলে কাতারে কাতারে পায়রা দেখে তার বিলিতি আদবকায়দা সবই নিমেষে ভ্যানিশ। একদল করে পায়রা এধার থেকে ওধারে ডানা ঝটপটিয়ে উড়ছে, ফোয়ারায়ে জলপান করছে, আর মেয়ের আমার, মুখ পাংশু থেকে পাংশুতর হয়ে চলেছে। কোথায় সকলে মিলে ট্র্যাফালগারের বিখ্যাত ফোয়ারাটার সামনে ক’টা ফ্যামিলি ফটো নিয়ে নেব, না পায়রার অত্যাচারে সেই মেয়ে তখন ভয়ানক আতঙ্কিত। গতকাল থেকে এদিক সেদিক ঘুরলেও, চারজনের একটা ফ্যামিলি ফটো নেওয়া হয়নি একটাও। এদিকে পালকিকে সুযোগমতন বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অ্যাডমিরাল নেলসনের গল্প। তাঁরই বুদ্ধিমত্তায় কেমন করে ব্রিটিশরা নেপোলিয়নের ফ্র্যান্সের বিরুদ্ধে ট্র্যাফালগারের নৌযুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। যুদ্ধে নেলসন সাহেবের একচোখ কানা, আর একটা পা খোঁড়া হয়ে যাওয়ায়, ক্রিকেটেও একশ এগারো রানে কোন ব্যাটসম্যান থাকলে, বিলিতি আম্পায়ার ডেভিড শেপার্ড কেমন কুসংস্কারে একপায়ে তিড়িং বিড়িং লাফাতে থাকতেন।

সূর্যটা বোধহয় ন্যাশনাল গ্যালারীর পিছনে চলে গিয়েছে। পিছন দিক থেকে একটা আলোর ছটা মতন আসায়, ট্র্যাফালগার স্কোয়ার থেকে অদূরেই গ্যালারীটাকে কি অসাধারণ লাগছে দেখতে। ওই যে ডানহাতের সোজা রাস্তাটা চলে গিয়েছে, ওটা বুঝি গেছে কভেন্ট গার্ডেনের দিকে, আর বাঁদিকে একশো মিটার হাঁটলেই তো চায়না টাউন। নেলসন সাহেবের নামের ওই মনুমেন্টটা পেরিয়ে নাক বরাবর সোজা চলে গেলেই, হাউস অফ পার্লামেন্ট, বিগবেন আর তার থেকে সামনে এগোলেই গতকালের বাকিংহ্যাম প্যালেস। পশ্চিমে তাকালেই একের পর এক দূতাবাসগুলো। এই এখানে দাঁড়িয়েই তো ক্যানাডা দেশের পতাকা ঝোলানো একটা বিশাল অট্টালিকার মতন বাড়ি দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা, গতকাল এতটা কাছে এসেও আমরা ট্র্যাফালগার স্কোয়ারটা দেখে গেলাম না কেন? অকপটে ওদের কাছে স্বীকার করে নিলাম আমার অজ্ঞতা। এরই মধ্যে দেখা গেলো, কয়েকটি সাহসী পর্যটক কোনপ্রকারে ওই মনুমেন্টের উঁচু সিংহগুলির কাছে গিয়ে উঠেছেন। সিংহের সামনে চড়ে, বীরদর্পে তাঁরা থামস-আপ করে দাঁড়াচ্ছেন আর নিচে দাঁড়ানো তাঁদের বান্ধবীরা ছবি নিয়ে নিচ্ছেন মোবাইলে। কেবল পায়রা ছাড়া, ট্র্যাফালগার স্কোয়ারে একটা অর্ধেক দুপুর কাটিয়ে আমরা ততক্ষণে ভয়ানক রোমাঞ্চিত।

বৃষ্টিটা কমেছে এতক্ষণে। মেঘহীন আকাশ, আর একটু যেন হালকা রোদও উঠে গিয়েছে এই সময়ে। ট্র্যাফালগার স্কোয়ারে লোক বুঝি বাড়তে শুরু করেছে একটু একটু করে। রাস্তার উল্টোপিঠেই, যেদিকটা পার্লামেন্ট, সেদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনটা চারিং ক্রস আর অন্যদিকের স্টেশনের নাম লেসটার স্কোয়ার। আচ্ছা, এরপরে ব্রিটিশ মিউজিয়াম যেতে গেলে, কোন স্টেশনের থেকে ধরব পরবর্তী ট্রেন? লেসটার নাকি চারিং ক্রস? চারিং ক্রসের সামনেই একটা ছোট্ট মেলা মতন বসেছে। দু চারটে খাবারের স্টল, হয়ত হট-ডগ আর আইসক্রিম বিক্রি করছে। দলে দলে উচ্ছল নারী পুরুষ সেই স্টলের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে লেসটার স্কোয়ার স্টেশনের দিকে। বাড়ি ফেরতা ব্রিটিশ যুবকদের রসিকতায়, খিলখিল করে হাসছে ব্রিটিশ সুন্দরীরা…

আমরা হাঁ করে বুঝি সেইসবই দেখে চলেছি। আর ঠিক তখনই তাদের মধ্যে এক যুবক দল ছেড়ে এগিয়ে এসে আমাদের শুধোলেন, আপনাদের গোটা পরিবারের এই ফোয়ারাটার সামনে কি একটা ফটো তুলে দেবো?

চলবে…

Leave a comment