হায়না তো চায়নায়ে মশাই ১৪ লন্ডন দ্বিতীয় দিন (৩) • জুন ২০১৯

ছেলেবেলায় ছুটিছাটায় বেড়াতে যাওয়া হত অনেক জায়গায়। কখনও উত্তরবঙ্গের পাহাড়, কখনও বিহার বা ওড়িশার কোন ক্ষুদ্র জঙ্গল। পুরী দিঘা তো লেগেই থাকতো হরদম, বছরে এক কি দুইবার। ছোটো কোন হোটেল বা লজে রাত্রিবাস করা, দুপাশ খোলা জিপগাড়ীতে যেতে যেতে, রাস্তার ধারের কোনো দোকানে ভাত, কচিপাঁঠার ঝোল বা আলুর চোখা। আর তারই সাথে একটা চায়ের প্লেটে নুন লেবু কাঁচালঙ্কা। একটা দিনের মধ্যেই কি গভীর আলাপ হয়ে যেত সেই জিপগাড়ীর চালকের সঙ্গে। সেই যুবককে দেখে কখনও মনেই হবেনা, গ্রামের বাড়ীতে তার চার-চারটি পুত্রকন্যা, তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। বিকেল একটু গাঢ় হলেই, হুট করে এখানে সেখানে জিপগাড়ী থামিয়ে, পান করে নেওয়া হত ঘন দুধের চা আর সুজির কটমটে কোন বিস্কুট। জিপগাড়ী পেরিয়ে যাবে কোনো একটা ব্রিজ, একটা নাম-না-জানা চড়া পরে যাওয়া নদীর উপর দিয়ে। হয়তো সেই নদীটির নাম জয়ন্তী অথবা অঞ্জনা। আর সে নদীর পাশেই হয়ত সে গাঁয়ের শ্মশানঘাট।

আচ্ছা, লন্ডনে শ্মশান নেই? টেমসের পাশে, কাশীর হরিশচন্দ্র ঘাটের মতন? এ শহরের হিন্দুরা কি মৃতব্যক্তিকে দাহ করেননা? খ্রীষ্টান বা মুসলমানদের মতন কবরই দেন? চল্লিশ পাউন্ডের কাছাকাছি খরচা করে অমন ট্যালটেলে বিলিতি চা পান করে, শ্মশান ছাড়া আর কিছুই তখন মাথায় আসছেনা। গিন্নিও বুক খালি করা নিঃশ্বাস ছাড়ছেন হাঁটতে হাঁটতে। সে হতোদ্যম ভাব, সে মন্দা-অবস্থা, দুম করে চায়ের দোকানে চল্লিশ পাউন্ড খরচের জন্যে, না হাঁটুর ব্যাথাটা তাঁর চাগাড় দিয়েছে আবার? জিজ্ঞাসা করতে জানা গেল, কোনোটাই নাকি নয়, কেবল ট্র্যাফালগার স্কোয়ার যাওয়ার রাস্তায়ে, সামনে ব্রিটিশদের ন্যাশানাল আর্ট গ্যালারী দেখার জন্যে প্রাণ নাকি তাঁর আঁকুপাকু করছে।

আর্টের নামে আমার গিন্নি মহিলাটি অতিপ্রতিক্রিয়া দেখালেও, সে ব্যাপারে আবার আমার যথেষ্ট বিতৃষ্ণা রয়েছে। আর সে কারণেই, গোড়ালীর ফোস্কার দোহাই দিয়ে, কোনোমতে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম ন্যাশানাল আর্ট গ্যালারির ট্যুরটা। কিন্তু অতর্কিতেই বৃষ্টি নেমে যাওয়ার কারণে, বউয়ের হাত ধরে ঢুকেই পড়তে হল সেই সুবিশাল অট্টালিকাটির ভিতরে। তবে আনন্দের বিষয়, এটিও ফ্রী। বাইরে ঝিরঝিরে বর্ষা আর ভিতরে কিনা বিনামূল্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিছু ছবির সংগ্রহ, এই দুয়ে মিলেই বুঝি চল্লিশ পাউন্ডের শোকটা ভুলে যাওয়া গেলো চট করে। আর কিছু না হোক প্রাকৃতিক দুর্যোগে, মাথার উপরে ছাদটা তো ফ্রী’তে পাওয়া যাবে।

ভিড় আছে কিন্তু ভিতরে। তবে ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতন এই ভিড় কাচ্চাবাচ্চাদের নয়। দেখা গেল, এখানে সব সমঝদারদেরই জটলা বেশী। তাঁদের মনোযোগী হাঁটাচলা, মোটা ফ্রেমের চশমা, তাঁদের অস্ফুট স্বরে কথাবলা আর তার সাথে উদাসীন পোশাক পরিচ্ছদ দেখলেই কিন্তু বোঝা যায়, এঁরা সকলেই আমার মতন ছ্যাবলা নন। প্রত্যেকেই খাঁটি রসজ্ঞ ব্যাক্তি। আর এখানেই প্রথম দেখতে পেলাম, সাহেবরাও চটি পরেন। দেড়দিন হয়ে গেল লন্ডনের রাস্তায়ে রাস্তায়ে ঘুরছি। একজনকেও দেখা যায়নি চটি পরে হাঁটছেন। ভিখারির গায়ে শতছিন্ন জামা পরা থাকেলও, পায়ে কিন্তু তাঁদের বেশ চকচকে রঙিন স্নিকারস পরতেই দেখা যাচ্ছে।

এই সুযোগেই গ্যালারির ভিতরের একটা বেঞ্চিতে বসে প্রথমেই খুলে ফেলা হল জুতোমোজা। দেখা গেল, মাত্র দুদিনের বিরামহীন হাঁটাতেই পা’টা কেমন যেন নীলচেমতন হয়ে গিয়েছে, প্রতিটি শিরা উপশিরা যেন এখুনি ‘ডিয়ার স্যার’ বলে একটা ছুটির দরখাস্ত লিখতে বসবে। তবে মজার বিষয় এই যে, আমার দেখাদেখি, প্রথমে আমাদের কন্যাযুগল ও তারপরে বেশকিছু নারীপুরুষ কিন্ত দখল করে নিলেন গ্যালারির বাকীসব বেঞ্চগুলোই। বসতে পেয়েই, তাঁদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন খুলে ফেলেছেন তাঁদের জুতোজোড়া। যাকগে, কোনো একটা বিষয়ে তো নিয়মের বাইরে গিয়ে, পথিকৃত হতে পারলো বাঙালী। শিল্প-পাগল সাহেবরাও তো শেষমেষ অনুকরণ করতে বাধ্য হলেন।

অন্যদিকে গিন্নিটি ততক্ষণে আর্টের ব্যাপারে চরম পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। মুখে একটা আলগা গাম্ভীর্য। আমাদের সামনে দিয়ে হনহন করে দ্রুতবেগে বেড়িয়ে গেলেন দুতিন বার। চিনতেই পারলেননা বুঝি। প্রায় ফুরিয়ে আসা ব্যাটারীর মোবাইল দিয়ে বিভিন্ন ধরণের ছবি তুলে রাখছেন, বিশাল বিশাল সোনার গিল্টিকরা ছবিগুলির। গ্যালারির প্রধানকক্ষে, যেটি কিনা সবচেয়ে বড়, সেখানে দেওয়ালে টানানো প্রায় সবই, দেখা গেলো, ধার্মিক গোছের ছবি। পনেরশো ষোলশ শতাব্দীর শিল্পীদের। নাম পড়লেই বোঝা যাবে, মোটের উপর সকলেই ফরাসি বা ইতালীয়। সব ছবিতেই হয় যীশুখ্রীষ্ট স্বয়ং আছেন বা অন্য কোনো ইউরোপীয় ধর্মগুরু আর রোমান রাজারানীরা। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতন এখানেও, সবকটি ছবির পাশেই সে ছবির ইতিহাস লেখা আর শিল্পীর সংক্ষিপ্ত বায়োডেটা। অনেকে দেখলাম ফটো নিচ্ছেন সেই ফলকগুলিরই। এক এশীয় দম্পতিকে তো দেখা গেল, শিল্পীর ছবি আঁকার মিডিয়াম নিয়েই খুব তর্কবিতর্ক চালাচ্ছেন নিজেদের মধ্যে।

পাশের বেঞ্চিতেই বসা প্রফেসর শঙ্কুর মতন দেখতে এক পক্বকেশ ভদ্রলোক আর দোমড়ানো কমলা গাউন পরা একটি সিরিঙ্গে মেয়ের কথা আড়ি পেতে শুনছিলাম অনেকক্ষণই। আর নিজের সাথেই নিজে বাজি ধরছিলাম, এরা কিছুতেই স্বামী – স্ত্রী নন! তাঁদেরই কথায়ে বোঝা গেলো, এই গ্যালারিতেই নাকি একটা ভ্যানগঘ, একটা দ্যভিঞ্চি আর একটা মাইকেলএঞ্জেলো রাখা রয়েছে। উপর তলায়ে। আরেব্বাস, তাহলে তো দারুণ ব্যাপার, ভীষণ নামজাদা তো সেসব ছবিগুলি। ঈশ! কলকাতায়ে থাকতে, বিড়লা অ্যাকাডেমি বা চিত্রকূট গ্যালারি দেখিনি কোনদিনই। এতগুলো বছর বসবাস করেও, মুম্বইয়ের জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারিও অদেখা অধরাই রয়ে গিয়েছে। ধুস, দেশের গর্ব অবন ঠাকুরই দেখলাম না। অবহেলা করেছি, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, হুসেন বা বিকাশ ভটচাজের মতন শিল্পীদের। আর এখানে এসে কিনা, ভ্যানগঘ আর দ্যভিঞ্চি নিয়ে আদেখলামো করা হচ্ছে? নিজের কাছে নিজেকে কৈফিয়ত দিতে পারা যাবে? পায়ের বেদনা ভুলে তখন কেমন যেন একটা চরম অপরাধীর মতন লাগছে! নাকি গিন্নিকে একবার বলব, মোবাইলে অন্তত ভ্যানগঘের ছবিটার দুটো ফটো তুলে নিয়ে আসতে? পরে নাহয় ধীরেসুস্থে দেখে নেওয়া যাবে। পরমুহূর্তেই আবার মনে হচ্ছে, না গুরু, এ কিন্তু একটা লাইফটাইম অপরচুনিটি, এই সুযোগ না মিলেগি দোবারা। বাইরে বৃষ্টি কমেনি তখনও।

চলবে…

Leave a comment