তিনজনেই নিশ্চিত ভেবে রেখেছিল তাদের পিকাডিলি সার্কাস নিয়ে যে সমস্ত বিচিত্র বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার বুঝি অনেকটাই বানানো। কি এমন আশ্চর্য জায়গা যে একটা লোক সারাদিন সে জায়গার মাহাত্ম্য নিয়ে বকবক করে চলেছে? একি নিউইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার নাকি? লন্ডনে তো দেখার জায়গা কম কিছু নেই, তবুও এই পিকাডিলি নিয়ে লোকটার এতটা মাতামাতি কিসের?
শেষবার পিকাডিলি সার্কাসে আসা হয়েছিল একা। দুহাজার পাঁচে। সেটাও হউন্সলো শহরতলী থেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে চেপে। সন্ধ্যে সাড়ে ছটা সাতটা অবধি অলসভাবে একাই বসেছিলাম আর গোটা এক প্যাকেটের কাছাকাছি সিগারেট শেষ করেছিলাম। সেবার মেঘ ছিল আকাশে আর মাঝেমাঝে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আজকের মতন রোদ্দুরহীন আলো নয়। সবাই কেন জানিনা আসা যাওয়ার পথে একবার আমার দিকে তাকিয়ে দেখে নিচ্ছিল। হয়ত ভাবছিল বুঝি, প্রাচ্যের এক যুবক কি বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে শেষমেশ পিকাডিলিতেই ঠাঁই নিলো? একজন ঝাঁকড়া চুলের গায়ক বিরামহীন গান গেয়ে যাচ্ছিলেন। কেবল ইংরিজিতে নয়, আরও বেশ কিছু অজানা ভাষার গান শুনেছিলাম তাঁর কণ্ঠে। সেই অপরাহ্নে আমার সামনে বড়বড় বাড়ির আলো নিভে গিয়েছিলো, অজস্র দোকানপাট বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। কেবল জ্বলজ্বল করছিল ওই কোনের বাড়িটার স্যানিও আর কোক লেখা বিখ্যাত নিওন সাইন দুটি।
আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের বাইরে বেরোতেই একটা ছোটোখাটো বিস্ফোরণ ঘটে গেল আজ। বিস্ফোরণই বলব, তার কারণ, তিনটি নতুন মানুষের কথা হারিয়ে গিয়েছে পিকাডিলি সার্কাস দেখে। স্বামীর দেওয়া বর্ণনার সাথে মিলল কি মিললনা, জানা গেলনা। তবে গিন্নি তো ভুত দেখার মতন চমকে উঠেছেন মনে হল। আর তাঁকেই বা দোষ দেই কেমন করে? আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে বারো পনেরো ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনেই অবিশ্রান্ত রঙিন জনস্রোত। শ্যাফটসব্যারি মেমোরিয়ালের কালো একটা মূর্তি আর সেই চাতালেই বসে আছেন সাত সাগর তেরো নদীর পারের শতাধিক নাগরিকেরা। সেদিনের মতনই আজও একটানা গান গেয়ে চলেছেন এক যুবক। গীটার বাজিয়ে আর তাঁকেই গোল করে ঘিরে অজস্র মানুষ তাদের মোবাইল ক্যামেরায়ে ছবি তুলে রাখছেন, কিছু পাউন্ডের বিনিময়ে।
মেয়েদুটি তখন কেমন একটু ঘাবড়েই গিয়েছে বোধ হচ্ছিল। বিশাল এক রাস্তার মোড়, প্রকাণ্ড কয়েকটি জটিল রাস্তা, একাধিক ট্রাফিক সিগন্যাল, রাক্ষুসে নিওন সাইন বোর্ডটা, সারি দিয়ে বড় ছোটো মাঝারি দোকান, ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, ব্যস্তসমস্ত অফিসযাত্রী আর তার মধ্যেই শতাধিক ফুর্তিবাজ নারী পুরুষের মাঝখানে নিজেকে তখন একটু হলেও অর্থহীন লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এ আবার কোথায় এসে পরলাম রে বাবা? হুঁশ করে পাশ কাটিয়ে, কে একটা চোখ ধাঁধানো সবুজ জ্যাকেট পরে, বাইসাইকেল চালিয়ে চলে গেলেন! একটা দমকলের লালগাড়ী অসম্ভব দ্রুত বেগে চলে গেল সাইরেন বাজাতে বাজাতে। সামনের রাস্তাটা দিয়ে, অন্য একটা গলির দিকে! সেকি লন্ডনেও কি আবার আগুনটাগুণ লাগে নাকি? কোথাও প্রযুক্তি, কোথাও ঐতিহ্য, কোথাও আড্ডা, আবার কোথাও বা একজোড়া জ্যান্ত নারী পুরুষ নিজেদের মধ্যে গভীর হয়ে পবিত্র চুম্বনে রত। পিকাডিলি সার্কাসে যেন সত্যই এক সার্কাস শুরু হয়েছিল অনেককাল আগে। সেই ক্রীড়া, সেই রঙ্গ, সেই প্রদর্শনী যেন শেষ হয়নি আজও। আমরা যেন এক অদ্ভুত রূপকথার উপন্যাসের মাঝখানে ঢুকে পরেছি।
সম্বিত ফিরে এলে, গিন্নি ব্যস্ত হয়ে পরলেন তাঁর শপিং’এ। এখানে আর ফ্রিজে লাগানোর চুম্বক নয়, একেবারে পদোন্নতি হয়ে কেনা শুরু হয়ে গেল বাচ্চাদের টি-শার্ট। অত্যন্ত দামী, তবুও পিকাডিলিতে কেনা তো! তা সামান্য কিছু কেনাকাটার পর, আমরা তখন সোজা হাঁটতে শুরু করেছি আপনমনে, যেন আজকে এটাই আমাদের শেষ গন্তব্যস্থল। আর ততক্ষণে পায়ের অবস্থা কিন্তু এককথায়ে শোচনীয়। একটু হেঁটে গেলেই ডানহাতে বিখ্যাত হার্ড-রক ক্যাফে। সেখানে সামান্য বিশ্রাম নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ঢুকে পরা গেল। একটু চা কফি বা বিয়ার পান করলে মন্দ হয়না। কিন্তু সেই ক্যাফে এখনও খোলেনি। দরজা ঠেলতেই ভিতর থেকে হুট করে বেরিয়ে এলেন আট দশজন প্রজাপতির মতন নারী।
তাঁদেরই পাশ কাটিয়ে আমরা ততক্ষণে ঢুকে পড়েছি পাশের বড় রাস্তায়, একটা মস্ত সিনেমা হল আর আকাশ ঢাকা দুটি ইউনিয়ন জ্যাকের পতাকা। আর সেই রাস্তাতে ঢুকেই জবাব দিয়ে দিল পা। অগত্যা বসে পড়া গেল একটি চায়ের দোকানে। যদিও তখনও আফটারনুন হয়নি, তবুও বিলেতের আফটারনুন টি তো একটা আনুষ্ঠানিক ব্যাপার। হাই-সোসাইটি’র গণ্যমান্য মেমসাহেবদের মধ্যে এই জাঁকজমক করে আফটারনুন টি ব্যাপারটার কিন্তু একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। সুগন্ধী চা আর তার সাথেই অর্ডার করা হল ক্লটেড ক্রিম আর স্ট্রবেরী জ্যাম দিয়ে স্কোন্স। সাহেবরা নাকি বিকেলের দিকে চায়ের সাথে স্কোন্স খান আর পুঁচকে পুঁচকে কেক এবং সরু করে কাটা চীজ আর শসার স্যান্ডউইচ। স্কোন্স’এর কথায় পরে আসা যাবে, কিন্তু তার আগে অসম্ভব মুখরোচক ক্লটেড ক্রিমের ব্যাপারটা বলে নেওয়া জরুরি। জিনিসটা আসলে জমানো দুধের ক্রিম। মিষ্টি নয় একেবারেই, কিন্তু কেমন একটা স্বতন্ত্র স্বাদ আছে। একদম ঘন কিন্তু আধা তরলিত ক্রিম চীজের মতন ব্যাপারটা।
দুটো টেবিল দূরেই চারটি সুদর্শন ছোকরা বসে বেশ জোরে জোরে কথা বলছে। দেখেই বোঝা যায়, এরা ব্রিটিশ নয়, খাঁড়া নাক দেখে মনে হয় গ্রীক নতুবা ইতালিয়ান। তাঁদেরই মধ্যে একটি অল্পবয়স্ক ছেলে বেশ গোলগাল দেখতে, নাকটাও স্বাভাবিক। লালচে দাঁড়ি আছে তার। সে বোধকরি ব্রিটিশই হবে। চা পান করা শেষে, গিন্নি গিয়েছেন টয়লেট ব্যবহার করতে। কন্যাদ্বয় নিজেদের মধ্যেই আলাপ করতে ব্যস্ত। আর এমন সময়েই ব্রিটিশ ছেলেটি এগিয়ে এসে, আমার থেকে হঠাৎ লাইটারটা চেয়ে বসল। এগিয়ে দিলাম লাইটারটা, আর তারপরেই বলে কিনা, ‘থ্যাঙ্ক ইয়উ স্যার।“ বলে কি সাহেবটা? সাহেবরাও আবার কাউকে স্যার বলে ডাকে নাকি?
চলবে…
Leave a comment