গত দুই শতাব্দী ধরে কলকাতার পার্কস্ট্রীট, এসপ্ল্যানেড, ডালহৌসি বা বাকী সকল অ্যাংলো পাড়ায়ে যেমন বসবাস করতেন বা বসতি করার একচেটিয়া অধিকার পেতেন কেবল সাহেবসুবোরাই, তেমনই আজকের বাজারে সাউথহল, ওয়েম্বলি, হউন্সলো, হ্যারো, রেডব্রিজ বা ক্রয়ডনে একবার গিয়ে শুধু পরতে পারলেই হল। দেখা যাবে বেতাজ বাদশার মতন রাজ করছেন কেবলমাত্র ভারতীয়রাই। লেসটার এলাকাটা আবার মোটামুটি ব্রিটিশদের পাড়া হলেও, দিনকে দিন নাকি সেখানে বৃদ্ধি পাচ্ছে গুজরাটিদের সংখ্যা। অন্যদিকে ব্রিকলেনে অধিকাংশই বাংলাদেশী আর নিউহ্যাম নাকি পুরোটাই প্রায় দখল করে নিয়ে বসেছেন পাকিস্তানিরা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভোল পালটে এখন ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ইন ইংল্যান্ড বললে খুব একটা ভুল বলা হবেনা। চিকেন টিক্কা মসালা তো প্রায় জাতীয় ডিশের পর্যায়েই চলে গিয়েছে আর এখন বোধহয় সে জিনিস বাকিংহ্যাম, কেন্সিংটন প্যালেস বা উইকেন্ডের উইন্ডসর ক্যাসলেও হ্যারি আর উইলিয়ামদের জন্যে তরিজুত করে রাঁধা হচ্ছে নিয়মিত। মোটকথায়ে, ভারতীয়রা আর সকল দেশের মতনই, সে দেশেও একটা বেশ ভালোরকমের সম্ভ্রম নিয়েই বহালতবিয়তে আছেন।
মাদাম তুসোর মোমের জাদুঘর কিন্তু সে হিসেবের বাইরে নয়। অতীতে সেখানে কি ছিল, কেউই প্রায় জানেননা। আর সে যাই থাকনা কেন, সে জায়গা আজকের জমানার ব্যবসায়িক দাবী মেনেই, একদম ভারতীয় পর্যটকদের মনোরঞ্জন করতেই যেন দিনকে দিন পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। তবে দেখা গেল, বাইরে কিছু সাহেব মেমদের লাইন পরেছে হয়ত, কিন্তু ভিতরে ঢুকেতেই সে জায়গা একদম যেন পুরীর স্বর্গদ্বার। হিন্দিতে বা গুজারাটিতে অনর্গল কথা বলে চলেছেন প্রায় সকলেই। কান পাতলে হয়ত টুকটাক বাংলাও শোনা যেতে পারে। জাদুঘরের ভিতরে এমন দেশজ সমর্থন পাওয়া যাবে, আগে থেকে জানা থাকলে, বাইরের টিকিট কাউন্টারের লালমুখো সাহেবটাকে আরও একটু কড়কে দিয়ে আসাই যেতো। টিকিট আমাদের কাটা ছিল আগের থেকেই, আর সেটা বোঝাতে গিয়েই, কি একটা কথার প্রত্যুত্তরে ব্যাটাচ্ছেলে বলে কিনা, কুড ইয়উ প্লিজ স্পিক উইথ মি পোলাইটলি? আরে বাবা, আমাদের ঠাণ্ডা মাথায়ে বলা ভারতীয় ইংরিজি ওই অমনটাই। আমরা কি আর বাপু তোমাদের মতন অতশত ভাষার মার্জিত মারপ্যাঁচ জানি নাকি? একবার তো ইডেনে ইংল্যান্ডের সাথে খেলা দেখতে গিয়ে, আমাদের বন্ধু শুভ্রশেখর চারটি বিলিতি সমর্থককে টানা পাঁচদিন ধরে ইংরিজি বলার ভয়ে, তাদেরই ক্রিকেটারদের নাম শুনিয়ে গেল। তারা আমাদের দিকে চোখ ফেরালেই শুভ্র বলতো, গুচ, গ্যাটিং, ফেয়ারব্রাদার। দেখিয়ে দিতাম আমাদের ভাষায়ে যদি কথা বলতে হত তোমাদের! সন্ধি সমাস কারক বিভক্তি মিলিয়ে কেমন পোলাইট ভাষা বেরোয়, পরীক্ষা হয়ে যেতো তোমাদের হাতেনাতে।
মাদাম তুসো যেন স্পেশাল অর্ডার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে পালকি আর তার ছোটো বোনটির কথা ভেবেই। দুজনেরই সব ফেভারিট রকস্টার আর পপস্টারেরা সব একত্রিত এক ছাদের তলায়। দু পা আগে গেলেই বাঁদিকে রিহানা, জাস্টিন বাইবার, আবার খানিক ডানদিকে ঘাড় ঘোরালে লেডিগাগা, ব্রিটনী স্পিয়ারস। আবার আমাদের মতন বুড়ো হাবড়াদের জন্যে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন বিটলস, বব মার্লি বা মাইকেল জ্যাকসন। বলিউডি ব্যাপারস্যাপারও বেশ উত্তেজনার। মাত্তর তিরিশ পাউন্ডেই, শাহরুখের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ো, কাঁধে হাত দিয়ে ছবি নিয়ে নাও সলমনের, বচ্চনের সাথে হ্যান্ডসেক করে নাও বিনা বাধায়ে। আমার গিন্নি তো দেখলাম ঋত্বিক রোশনের মুর্তিতে খুব একটা সন্তুষ্ট না হলেও, পরের দিকে ব্রুশ উইলিস, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি, লিওনার্ডো ডিক্যাপ্রিও আর টম ক্রুজ বা জর্জ ক্লুনীকে হাতছাড়া করেননি একদম। আমারও ইচ্ছে হয়েছিল জুলিয়া রবার্টসকে জড়িয়ে একটা অন্তরঙ্গ ছবি নিয়ে নেওয়ার, কিন্তু জুলিয়াটা দেখলাম ব্যাটা বড্ড বেঢপ লম্বা। আমার সাথে তাঁকে মানালনা এক্কেবারেই।
জাদুঘরের ওপর-নীচ, নকশা বা মানচিত্র গুলিয়ে গিয়েছিলো ঢুকে যাওয়ার পরেই। ওই বলিউডী সেকশনের পর থেকেই। তারপরে কোথাও আইনস্টাইন, কোথাও ম্যান্ডেলা, বা আবার কোথাও চার্লি চ্যাপলিন – দেখে নাও, মোবাইলে ছবি নিয়ে নাও আর শুধু এগিয়ে যাও জনগণের স্রোতে। যেন কুরলা স্টেশনে ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে। পেছনের চাপে, আপনাকে ট্রেন থেকে নেমে যেতেই হবে। সে আপনার গন্ত্বব্য যতই দাদার বা প্রভাদেবী হোক না কেন! কেবল সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। যাত্রাপথে কোথাও একটা স্যাঁতস্যাঁতে সিঁড়ি, কোথাও বা একটা কৃত্রিম গুহা, কখনও উপরে, কখনও নিচে, এইভাবেই চিহ্নের সাথে সাথে কন্যাযুগলের হাত চেপে এগিয়ে চলেছিলাম আমরা কর্তা গিন্নি। হঠাৎ দেখি আকস্মিকভাবেই ট্রাফিক গিয়েছে থেমে। একবার তো উঁকি মেরে দেখতেই হচ্ছে। পালকিই এগিয়ে গেল আমাদের ছেড়ে। তারপরেই উত্তেজিত হয়ে সে এসে বলে, বাবা এখুনি এসো একবার। দেখ – স্বয়ং মোদী। তারপরেই কেবল ক্যামেরার খ্যাচখ্যাচ। কিরকম একটা অকারণ আবেগপ্রবণ হয়ে পরেছেন পর্যটকদের সকলেই, আরে বাপরে বাপ! পুরো আস্ত মোদী সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁর চিরাচরিত হাপপাঞ্জাবী, জ্যাকেট আর চুড়িদার পরিহিত হয়ে।
তারপরেই সিদ্ধান্তে আসা গেল, নাহ! আর নয়… আর স্পাইডারম্যান, আয়রনম্যান দেখার কোন মানে রইলনা কিছুই… চলে চল এইবারে! যা দেখার দেখা হয়ে গিয়েছে আমাদের! এবার না হয় শার্লক হোমস দেখে কিছু একটা খেয়ে নেওয়া যাবে। মোদীকে সামনে থেকে দেখে নিলেও, পেটের খিদে কিন্তু তখনও মরেনি এতটুকুও।
চলবে…
Leave a comment