হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৮ লন্ডন প্রথম দিন (৩) • জুন ২০১৯

আচ্ছা, ইতিহাস মানেই কি রাজারানিদের গল্প? তবুও আমাদের বৈদিক যুগ, মহেঞ্জোদারো হরপ্পা অবধি ঠিকঠাক চলেছিল। তারপরেই কোত্থেকে যে দুম করে চলে এলেন মহামতি অ্যালেক্সান্ডার, আর তার সাথে সাথেই একধার দিয়ে সরলরেখায়ে চলতে শুরু করল মগধ, মৌর্য, চোল, কুষাণ, গুপ্ত, পাল, ইত্যাদি। আর সেই অনুসারেই শুরু হয়ে গেল সুলতান, মুঘল, মারাঠা, ব্রিটিশ, গান্ধী। এ কিন্তু ঐতিহাসিকদের একটা ভারী অন্যায়। হ্যাঁ, সাময়িক অব্যাহতি দিতে, মাঝেমধ্যে এসেছিলেন গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর বা নবরত্নের সভা। কিন্তু সেটুকুই কি যথেষ্ট, সেদিনের সমাজ, মানুষ আর তাঁর জীবনকে বুঝতে? কে কাকে যুদ্ধে হারালেন, কি ভাবে আর কোন সনে হারালেন, কেবল এটুকু জানলেই কি চলবে আমাদের? জাদুঘরগুলিতে ভর্তি করে রাখলেই চলবে, যুদ্ধে ব্যবহৃত বর্ম, বল্লম আর কামান? হেরে যাওয়া রাজাটির খবর কি পাওয়া যাবেনা কোথাও?

ওয়েস্টমিন্সটার গির্জা দেখে বেরিয়েই ডানহাতে টেমস নদীর উপরে যে ব্রিজটি, সেটির নামও ওয়েস্টমিন্সটার ব্রিজ। স্টপেজ ফসকে ততক্ষণে হাঁটা হয়ে গিয়েছে তিন-চার কিলোমিটারের মতন, আর গোড়ালির ব্যাথা একটু কমাতেই বুঝি ওই ব্রিজটির উপরে পশরা নিয়ে বসা, স্ট্রীটশপিং’এ তখন নজর সকলের। শপিং বলতে ওই ফ্রিজে লাগানোর বিভিন্ন ধরনের চুম্বক, আর হরেক রকমের ছোটোখাটো স্মারক-গিফট। গিন্নি যখন তাঁর বান্ধবীদের গিফট বাছছেন আর প্রাণপণ চুরাশির নামতা দিয়ে গুন করে চলেছেন প্রতিটি দাম লেখা স্টিকারকে, আমি আলস্যভরে ভাবছিলাম ইতিহাসের কথা। ভাবছিলাম, গির্জার গায়ে তো কেবল রাজারানিদের নামই লেখা দেখলাম। অষ্টম হেনরি, পঞ্চম ফিলিপ, দ্বিতীয় এডওয়ার্ড, প্রথম রবার্ট, ষষ্ঠ জেমস, এইসবই শুধু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে দেখেছেন দর্শনার্থীরা। আর মাথা উঁচিয়ে, সূর্যটাকে খানিক ঢেকে দিয়ে, সদম্ভে দাঁড়িয়ে একটি সুবিশাল রোমান স্থাপত্যকর্ম। ওয়েস্টমিন্সটার এবি। অবশ্য নেটফ্লিক্স সিরিজে দ্য কুইন দেখার সুবাদে, গিন্নিও দেখলাম সকলের মতন হামলে পরে দেখে নিচ্ছেন সেইসব। পড়ে নিচ্ছেন রাজারানির নাম। চারিপাশের সবুজ বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন রাজরাজড়াদের ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। আর নিচে রোমান হরফে তাদের নাম ও কতক গুণাবলী। তাও সে লেখাগুলি এতোটাই উচ্চতায়ে, যে আমাদের তৃতীয় বিশ্বের বেঁটে মানুষের তো ঘাড়ব্যাথা হওয়ার জোগাড়। মাঝে তো দুবার হুকুমও এলো, কিছু বাছাই-করা ফলকের ফোটোগ্রাফ নিয়ে নেওয়ার জন্য। কি না, সেগুলি পরে, পড়ে খুঁটিয়ে দেখে নেওয়া যাবে।

একটি ভারতীয় পরিবারকে পাশে দেখে তো ভয়ঙ্কর রকমের ইংল্যান্ডীয় ইতিহাসে আগ্রহী বলে মনে হল। ঢাউস একটি ক্যামেরায়ে পেল্লায় একটি জুমলেন্স লাগিয়ে বাপ ফটোগ্রাফি করে চলেছেন গির্জার আর যাবতীয় ভাস্কর্যের। কে জানে বাবা? বিলেত বলেই বোধহয়, নইলে আগ্রাফোর্টে আরেকটু সময় দিলে বোধহয় ভালো করতেন ভদ্রলোক। সে দুর্গের নির্মাণকৌশলও তো আমার দেখা অন্যতম সেরা একটি ব্যাপার। ইতিহাস উত্তর দেয়না কিছুরই। ইতিহাস জবাব দিতে পারেনি, কতবার কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ হেঁটে গিয়েছেন এই ওয়েস্টমিন্সটার ব্রিজের উপর দিয়ে? আচ্ছা, টেমস নদীতেও কি মানুষজন গঙ্গার মতন ডুব দিয়ে স্নান করেন বা অতীতে করতেন? কিছু না হলেও, গোটা আটেক ব্রিজ বানিয়েছেন ব্রিটিশরা টেমসের উপরে, তাহলে গঙ্গার উপরে মাত্র হাওড়া ব্রিজ বানিয়েই কাজ সারা হয়ে গেল কেন তাদের? ওই যে তরুণী নারীর দলটা ব্রিজের উপরে বসে ছবি আঁকছেন, আর চারপাশে ভিড় করে মানুষজন উঁকি মেরে দেখছেন, এ প্রচলন কবেকার? কে করেছিলেন এর শুরু? এ সব অবান্তর প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আছে, তবে ইতিহাসের কাছে নেই। ইতিহাস যে কেবল রাজাদের কথা বলে। আমাদের নয়।

তবে ব্রিজের উপরের দোকানগুলিতে একটা মজার জিনিস দেখতে পাওয়া গেল। আর সে জিনিস প্রায় সব দোকানেই রেখেছে দেখলাম। একটা ছোট্ট চারইঞ্চির বেগুনী ফ্রক পরা পুতুল। আলাদা করে না বলে দিলেও চলবে, সেটি কিন্তু বর্তমান রানিমা এলিজাবেথের একটা ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ। বোধহয় সোলার পাওয়ারে চলছে সে আহ্লাদী পুতুলটি আর সারাটা সময় ধরে সে নিরবধি ঘাড় নেড়ে, সকলের মনোরঞ্জন করে চলেছে। ইংল্যান্ড তো রাজারানিদের দেশ, কিংডম। এ জিনিস তাহলে দেশের সরকার থেকে মঞ্জুর করা হয়েছে, তার মানে? গণতন্ত্র গণতন্ত্র চিল্লিয়ে আমরা ভারতবাসীরা এত গলা ফাটাই, আমরা কি আমাদের দেশের দোকানগুলিতে এমন একটা কৌতুকপ্রদ পুতুল রাখতে পারব গান্ধীজীর বা একটা কি প্রাহসনিক কার্টুন আঁকা যেতে পারে রবিঠাকুরের? কবিগুরু সারাটাদিন আম্রকুঞ্জে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কোমর হিলিয়ে চলেছেন সকলের বিনোদন করতে?

চিরায়ত মতের মনার্কি না হয় নেই আমাদের দেশে, কিন্তু যেটা রয়েছে বা গত ষাটটি বচ্ছর ধরে চলে আসছে, সেটিকে অ্যারিষ্টক্র্যাসি ছাড়া কিছু বলা যাবেনা। ডেমোক্র্যাসি তো নয়ই। গণতন্ত্র এখনও আমাদের দেশে হয়ত সেই প্রাথমিক রূপেই রয়ে গিয়েছে, বিলিতিদের মতন আধুনিকতম রূপ পেতে তার এখনও দেরী রয়েছে ঢের। ব্রিজের দুধারে অসংখ্য দ্রষ্টব্য। লন্ডন আই, কান্ট্রি হল, পুরসভা, এইসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে দুদিকেই। সে সব দেখতে দেখতেই এলাকার বড়দা বিগবেন বলছেন দেড়টা বেজে গিয়েছে। মা বোধহয় কলকাতায়ে রানি রাসমণি দেখে এই একটু শুলেন। নাহ… মোমের পুতুল দেখতে গেলে, এইবেলা দৌড়নো উচিত পা ব্যাথাফ্যথা ভুলে।

চলবে…

Leave a comment