কমপক্ষে হাজার দশেক দর্শকের জন্য মাত্র তিনখানা পুলিশ দেখে ভাবছিলাম, ব্যাটারা নিশ্চয়ই প্লেন ড্রেসের খোঁচর রেখেছে। ঘাপটি মেরে বসে আছে এদিক সেদিক। আরে ভাই! প্রথিত স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বলে কথা। এত’টা কাঁচাকাজ কি আর তারা করবেন? আর বাস্তবিকই, আশেপাশের দুচারজন সাহেবের অগ্নিমূর্তি হাঁটাচলা দেখে, ভেবেও নিয়েছিলাম তারা আদপে পুলিশ। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। ভিড়ের মধ্যে দুতিনটে সাহেবকে কনুই করে আর মেমেদের পা মাড়িয়ে, বাকিংহ্যাম প্যালেসের দরজার দিকে মোবাইল ক্যামেরা নিয়ে এগোনোর সময়ে, ওইরকমই এক দাঁতখিচোনো সাহেবকে প্লেন ড্রেসের রক্ষী ভেবে, টুক করে সরিও বলে নিয়েছি একবার। কিন্তু তারাও তো রোববারের সকালে রানির প্রাসাদের ছবি ওঠাতে আমার মতনই ব্যস্ত দেখা গেল। অর্থাৎ কিনা, হিসেব দাঁড়ালো, ওই পুরো দশ বারো হাজার জনগণের জন্যে, সাকুল্যে ওই তিনটি রক্ষীই বরাদ্দ করেছেন সরকার বাহাদুর? আচ্ছা এঁদের কি আমাদের দেশের মতন সন্ত্রাসবাদের ভয়টয় নেই নাকি?
ওই তিনটির মধ্যে, একটি তো মহানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন একটা বাইসাইকেল চেপে। একটা টহল দেওয়ার মতন কিছু একটা করছেন বলে বোধ হল। আরেকটি ইউনিফর্ম-ধারী সামান্য বয়স্ক, আর মনে হল, একটু খানিক আলসেও বটে। একই জায়গায়ে দাঁড়িয়ে তিনি দেশের আইন প্রয়োগ করছেন। আর সেটাও মুহুর্মুহু ঠোঁটের ভিতরে আঙুল ঢুকিয়ে সিটি মেরে। অনেকটা আমাদের বাবুঘাটের ভাসানের মতন। আর তৃতীয়টি তো নেহাতই বাচ্চা। হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন বেচারা সারা পৃথিবীর দর্শনার্থী সামলাতে। এতো লোক আসে প্রতিদিন সকালের চেঞ্জ অফ গার্ড দেখতে? নাকি রোববারের ছুটির দিন দেখে, আজকেই উপচে পরেছে ভিড়? তাছাড়া দেখারই বা কি আছে? গার্ড তো যতই বদলানো হোক না কেন, বেচারাদের তো ওই নাক অবধি কালো ভালুকের লোমের টুপি আর লাল টুকটুকে জামা পরে নিঃশ্বাস চেপে (ও আরও অনেক কিছু চেপে) ঠায়ে দাঁড়িয়ে থাকা! রানিমা কি দেখে বুঝবেন, গতকালকের কারা ঘরে ফিরলেন আর আজকের সকালে কারাই বা তাদের বদলি ডিউটি দিতে এলেন?
তারই মধ্যে বাচ্চা পুলিশটি মাঝে মাঝেই পকেটমারির ভয় দেখাচ্ছেন জনসাধারণকে। তাছাড়া ‘লোনলি প্ল্যানেট’ বইটিতে অবশ্য তেমনটিই পড়েও নেওয়া হয়েছিল ইতিমধ্যেই। মেয়েরা আর তাদের মা ভদ্রমহিলা মারকাটারি রকমের স্মার্ট সেজে এসেছেন। হাসিখুশি ফুরফুরে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এদিক সেদিক। তাঁদের ভয় ছিল বৃষ্টির, আর সেটা যখন নেই, তখন পকেটমারির কোন ছাড়! বারে বারে মনে করিয়ে দিতে হচ্ছে, আরে আদ্ধেক পাউন্ড সামলে রাখার কথা! বাকী আদ্ধেক যে আমারই পকেটে। মা একটি ওভারসাইজড সানগ্লাস পরেছেন, আর বড়টি আবার একটি পপসিঙ্গারদের মতন ছোট্ট ক্যাট আই গ্লাসেস। আর তারই সাথে ছোটোটি’র বিলিতি প্রাসাদ নিয়ে হাজারো প্রশ্ন। পকেট সামলে, কনিষ্ঠার কৌতূহলের অবসান ঘটিয়ে, মেয়ে – বউয়ের একাধিক ভঙ্গিমায়ে ছবিটবি তুলে দিয়ে, যখন সবেমাত্র বাচ্চা পুলিশটির সঙ্গে একটু ভাব জমানো গিয়েছে, তখন কাঁটায় কাঁটায় দশটা বাজে।
দেখা গেল, অকস্মাৎ লোকজনের ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সকলে কেমন যেন নিজেদের দখল নেওয়া জায়গাটিতে চুপটি করে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন শাস্তিপ্রাপ্ত স্কুল বাচ্চাটির মতন। আর আচমকা চারিধার নিশ্চুপ। একটা পিন পড়লেও যেন শব্দ পাওয়া যাবে। আমার পাশেই দাঁড়ানো এক সজ্জন জাপানি তো গার্ড বদলানোর বিউগল বাজনা কানে আসতেই, কেমন যেন একটা বিহ্বল হয়ে পরলেন। আর বিরাটকায় আরবি ঘোড়ায় চেপে বীরপুরুষ গার্ডেরা যখন একদম সামনে এসে পরেছে, ঝমঝমাঝম করে বাজছে রানি বন্দনার বিলিতি সঙ্গীত, তখন মুহূর্তেই জাপানি দাদাটি একেবারে ধনুকের মতন বেঁকে গিয়ে প্রণিপাত করে একবার নমো করলেন বলে মনে হল। স্বভাবসুলভ ফচকেমিতে একবার জাপানি দাদাটিকে শুধু বলেছি, ‘নট দি কুইন স্যার, ওনলি হার পুওর গার্ডস’। জাপানিকে করা তামাশাটি শুনেই, আচমকা দেখি দুই মেয়ের হাত ধরে, তাদের মা হাঁটা লাগিয়েছেন বহির্গমনের পথের দিকে। কি না? জাপানিকে এমন প্রহসনটা নাকি উনি একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। অগত্যা একটা অনর্থক কৌতুকের জন্যেই আমাদের বাকিংহ্যাম প্যালেসের গল্প ওইখানেই শেষ করে, হাঁটা লাগালাম গোল্ডেন ট্যুরস এর বাসস্টপের দিকে। পরবর্তী বাস আসতে সময় নিয়েছে মিনিট পাঁচেক মতন। ততক্ষণে ‘আর জীবনে কোনদিন জাপানিদের কোনপ্রকার উপহাস করবনা’ বলে বারচারেক দিব্যি কাটা হয়ে গিয়েছে মা-কালীর নামে। আর এ ধরনের কোনও রকমের দুষ্টুমি দেখলে, সে নাকি সোজা প্লেন ধরে ইন্ডিয়া।
এইসব অনুপযোগী খুনসুটি আর ঝগড়াঝাঁটির মধ্যেই, বিগবেন আর ওয়েস্ট মিন্সটার যে পেরিয়ে গিয়েছে, সে খেয়াল করা হয়নি একেবারেই। তাছাড়া বিগবেনে অল্পবিস্তর মেরামতি বা কোনরকম সংস্কারের কাজ চলছে, তাই সে ঘড়িটুকুন দেখা গেলেও, টাওয়ার কিন্তু আগাপাশতলা কালো তেরপলে ঢাকা। তবে আগে থেকে এত ছবি দেখা, এত ওয়েবসাইট ঘাঁটা সত্ত্বেও, নীল বাসের ইয়ারফোনে বারংবার ঘোষণা সত্ত্বেও, ওয়েস্টমিন্সটারটা মিস হয়ে গেছে আমাদের। তাহলে কি পার্লামেন্ট, ওয়েস্টমিন্সটার এবে, লন্ডন আই, সাউথ ব্যাঙ্ক, সবই ফসকে গেল নাকি?
চলবে…
Leave a comment