হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৬ লন্ডন প্রথম দিন (১) • জুন ২০১৯

এদেশে আসার আগে অবধি সকলের ধারণা হয়েছিল, লন্ডনে পৌঁছে ভয়ানক রকমের ঠাণ্ডা পেতে হতে পারে। এমনকি আমাদের কনিষ্ঠা কন্যাটি তার অলীক কল্পনায়ে ভেবে রেখেছিল, যে কোনদিন হয়ত দেখা যাবে দুম করে তুষারপাত হতে শুরু করেছে। সেইরকমের ভেবেই যখন ভোরের প্রথম ধূমপানটি করতে হোটেলের নিচে নেমেছি, তখন পরনে পুরু গরম জামা, গরম টুপি আর গলায় একটা মোটা মাফলার। এমন সতর্ক ব্যবস্থা যে, ভেতো বঙ্গসন্তানের যেন চট করে বিলেতের ঠাণ্ডা না লেগে যায় কোনমতেই। হোটেলের নিচে নেমে আলাপ হল আল–মাদিদ নামের এক কাতারি ভদ্রলোকের সাথে। কাতারি হলেও, লোকটি বসবাস করেন কিন্তু ওমান দেশে। ধূমপান করছেন তিনিও। আর চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আরও গোটা চারেক নারী পুরুষ। বাকী সকলের মতনই, মাদিদেরও পরনেও একটা পাতলা ছাই রঙের গোলগলা গেঞ্জি, সুতির চেক পাজামা আর পায়ে চপ্পল। মনে হল, সকালের সিগারেট ফুঁকে সজোরে বেগ আনবার চেষ্টা করছেন মাদিদ। নতুন জায়গার উত্তেজনায়ে কিনা জানিনা, ওই জগঝম্প গরম কাপড়ে কিন্তু প্রথমদিকটা উষ্ণ লাগছিলনা তেমন। তবে আরামও যে খুব লাগছিল, সে কথাও বলা যাবেনা। ঘড়িতে সকাল সওয়া-সাত, আকাশে সামান্য মেঘ থাকলেও, সূর্যোদয় কিন্তু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। মোবাইল ফোনের অ্যাপে তাপমাত্রা বলছে উনিশ, আর সেটা দেখেই প্রথম খুলে নিলাম মাফলার আর তারপরেই একে একে গরম জামা ও টুপি। বলাই বাহুল্য, সামান্য আরাম কিন্তু পাওয়া গেল ওসব ধরাচুড়োগুলি খোলার পরেই।

সারা পৃথিবীতে ইংরিজি প্রাতরাশ রীতিমতন সুবিদিত ব্যাপার। তবে কেন্সিংটনের মাঝারি মাপের হোটেলটিতে ব্রেকফাস্ট যে মামুলিই হবে, সে কিন্তু একদিক থেকে আমাদের প্রত্যাশিতই ছিল। গরু শুয়োর আমরা কেউই খাইনা বলে, আমাদের ভাগ্যে ওই রকমারি পাউরুটি, জ্যাম, মাখন, সুগন্ধি দই আর স্ক্র্যামবেল্ড ডিমভাজা। ব্রেকফাস্ট টেবিলে জানা গেলো, হোটেলের কর্মচারীরা প্রত্যেকেই প্রায় ইস্ট ইউরোপীয়। জানালেন রিসেপ্সন কাউন্টারের একজন নারী। তাঁর নাম অঞ্জলি। এক্কেবারে বাঙালী আদল। আঙুলে একখানা পলার আংটি পরিহিত থাকলে আমি তো খাঁটি বাঙলাতেই বোধহয় কথা বলা শুরু করে দিতাম তাঁর সাথে। কিন্তু মেয়েটি আদতে নেপালী, আর আমি কিনা প্রথম থেকেই তাঁকে বাঙালী বলে মনে করেছি। পূর্ব ইউরোপের তথ্যটা অঞ্জলিই জানালেন আমাদের। কর্মচারীদের মধ্যে কেউ এসেছেন সুদূর এস্তোনিয়া থেকে, কেউ লাতভিয়া, কেউ বা আবার লিথুয়ানিয়া। এঁরা সকলেই নাকি সকালের দিকে ব্রেকফাস্টের কাজটা সামলে দিয়েই লেগে পরেন হোটেলের হাউসকিপিং’এর কাজে। তবে অঞ্জলি এও জানালেন, রাতের দিকটা যারা হোটেলে থাকেন, তাদের মধ্যে একজন নাকি দক্ষিণ ভারতীয়ও আছেন। তবে সেই মহিলাটি তামিল না তেলেগু, নাকি কন্নড়, সে ব্যাপারে কোন ধারণা নেই অঞ্জলির।

শহরটা নিজের ইচ্ছেমতন, নিজের অভিরুচি অনুযায়ী ঘুরে দেখবার জন্য, বার্সিলোনা, প্যারিস, রোম, ভিয়েনা, লস এঞ্জেলেস, এমনকি খোদ নিউইয়র্কেরও হপ-অন-হপ-অফ সার্ভিস রয়েছে। তবে সকলে কিনা বলেন, পৃথিবীর সবার সেরা সার্ভিস কিন্তু লন্ডনের। হপ-অন-হপ-অফের হিসেবটা প্রথমেই ঠিকমতন স্বচ্ছ হচ্ছিলনা আমাদের ছোটজনের মাথায়ে। তারপরে যখন হোটেলের ব্রেকফাস্ট সেরে, হাঁটাপথে গ্লস্টার রোড আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, আর তার উলটোপিঠেই সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝকঝকে লাল রঙের হুডখোলা দোতলা বাস, তখন হপ-অন-হপ-অফের ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখে সহজবোধ্য হল পুরো ব্যাপারটা।

আমাদের বাস কোম্পানির নাম গোল্ডেন ট্যুরস আর সেই বাসের রং নীল। ছোটোটি যখন বাবার সামনে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে ছবির পোজ দিচ্ছে, পালকি ও তাঁর মা ততক্ষণে ঠিক করে ফেলেছেন আজকের যাত্রাপথ। গ্লস্টার রোডের সামনে, প্রায় একটা ছোটখাটো বোর্ড-মীটিং গোছের সেরে নিলেন দুজনেই। মীমাংসা হল, প্রথমেই রেড লাইন ধরে বাকিংহ্যাম প্যালেসে গিয়ে দেখে নেওয়া হবে ‘চেঞ্জ-অফ-গার্ডস’, তারপরে হাঁটাপথে নয়ত আবার কোম্পানির বাসে চেপে, বিগবেন-ওয়েস্ট-মিন্সটার দেখে টেমস নদীর উপরের ওয়াটারলু ব্রিজ পেরিয়েই ধরে নিতে হবে কোম্পানির অরেঞ্জ লাইনের কোন চলতি বাস। আর ওই অরেঞ্জ লাইন ধরেই আমাদের পৌঁছে যেতে হবে মোমের ভাস্কর্যের জাদুঘর মাদাম-তুসো। সময়সুযোগ হলে রাস্তায়ে কিঞ্চিত আহার। নয়ত তুসোর জাদুঘর বন্ধ হয়ে যেতে পারে বেলা চারটের আগেই। আবার আজকেই নাকি টিকিট কাটা রয়েছে টাওয়ার অফ লন্ডন এবং টেমস নদীর উপরে নৌকাবিহারের। সে টিকিটও তো আর নষ্ট হতে দেওয়া যায়না! সুতরাং সামনে অনেক কাজ, অনেক হাঁটা। সম্পূর্ণ একটা কর্মশীল দিন।

বলতে না বলতেই সামনে এসে গিয়েছে একটা নীল রঙের দোতালা বাস। অনেকটা আমাদের এল নাইনের মতন… যা থাকে কপালে…। ‘জয়-মা-কালী’ বলে উঠে পরা গেলো বাসটির উপরতলায়।

চলবে…

Leave a comment