মুম্বইয়ের লোয়ার পারেলের মার্ক্স অ্যান্ড স্পেন্সার্সের দোকানটি কিন্তু, লন্ডনের কোন বড় দোকানের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। ওই বিলিতি দোকান থেকেই বছরখানেক আগে কেনা একটা চারকোল রঙের হাতকাটা ফ্লিস জ্যাকেট আর হালকা কালো একটা নিউজবয় হ্যাট পরে গ্যাটুইক বিমানবন্দরে নামতে গিয়ে নিজের মনেই নিজেকে বলে উঠলাম, “অ্যা লন্ডনার হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ হোয়েয়ার ইয়উ আর বর্ন”। আর বিমান থেকে নামার সময়ে সামান্য ফচকেমি করে ইচ্ছে হচ্ছিল ক্যাপ্টেন ভদ্রলোককে একটু হাঁক আসব কিনা, “ইয়উ ফ্লিউ সো ভেরি ওয়েল, চীফ। টেক কেয়ার মাইট”। কিন্তু সে সুযোগ হলনা। কারণ আমাদের ড্রাইভার ভদ্রলোক, মিস্টার আলি ফোন ধরছেননা। শনিবারের ভর সন্ধ্যে, দেশে তো ততক্ষণে মাঝরাত! ট্র্যাভেল এজেন্টের মেয়েটিও নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে কাদা। কাকে যে যোগাযোগ করব, তেমন কোন ঝামেলা হলে? আলি কি তবে ঘুমিয়ে পরলেন নাকি? এ সমস্ত দোনোমোনো’র মাঝখানেই চারজনে তখন বেশ ভ্যাবাচ্যাকা। দ্রুতপায়ে হেঁটে চলেছি ইমিগ্রেসন লাইনের দিকে।
লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরটি অতি সাধারণ মানের। হিথরোর ধারে কাছেই আসেনা। লন্ডন হিথরোর মধ্যে যেমন একটা রাক্ষুসে দানবীয়, একটা অতিকায় ব্যাপার আছে, আর তারই সাথে আছে একটা জাদুমুগ্ধ চারুতা, সেটা পৃথিবীর আর কোন এয়ারপোর্টে দেখা যায়না সচরাচর। ইমিগ্রেসন লাইনে এসেই সব এশিয়ানরাই দেখালাম বেশ খাপ্পা। আর হবেন নাই বা কেন? ইমিগ্রেসন বলতে একটি বৃহৎ হলঘর। আর তাতে দেখা গেলো, আমেরিকা, ক্যানাডা, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, স্পেন, জার্মানি ও আরও বেশ কিছু ইউরোপীয় দেশ ছাড়া সকলেরই এখানে পৃথক লাইন। মায় মেক্সিকোও আছে তাদের দলে। অন্যদিকে আরও একটা বড় লাইন পরেছে, আর সেটা বোধহয় পীত চামড়ার চীনে জাপানিদের। আর আমাদের মতন খয়েরি চামড়ার লাইন হলের এক্কেবারে অন্যদিকে। যাইহোক, লাইনের বর্ণবৈষম্য পেরিয়ে, মালপত্তরও আস্ত পেয়ে গিয়ে, গ্যাটউইক থেকে বাইরে বেরিয়েই কিন্তু আমাদের মনখুশ। কারণ ‘দাশগুপ্ত’ লেখা আইপ্যাড হাতে দেখা পাওয়া গিয়েছে মিস্টার আলির।
মাথায়ে উসকো-খুশকো সোনালি চুল, চোখে চশমা আর বেশ রাশভারী একটা চেহারা ভদ্রলোকের। নামটা শোনা থেকে অনেকক্ষণ ধরে মতলব ভাঁজছিলাম, আলিকে আমাদের মুম্বইয়া হিন্দি একটু শুনিয়ে ছাড়ব। কিন্তু তাঁকে দেখে, কেবল একটা হ্যালো ছাড়া আর কিছুই বলে উঠতে পারলাম না। কারণ আলিবাবু বিলিতি সাহেবেরও বাড়া। ওই শনিবারের সন্ধ্যেয়, যে উনি হ্যাট-কোট-টাই পরিহিত নেই, সে নিয়ে এক দুইবার দুঃখপ্রকাশ করে নিলেন, কনিষ্ঠাটির হাত থেকে সুটকেসটি নেওয়ার সময়ে। গ্যাটউইকের পার্কিং সামনেই, একশো মিটার দূরত্বও হবেনা। সেই পার্কিং অবধি আলির সাথে হেঁটে এসে, তাঁর সুবিশাল কালো মার্সিডিজ গাড়িটিতে মালপত্তর চড়ানোর সময়ে, আমরা তখন প্রত্যেকেই বেশ বিচলিত। রিয়ার মুখে একটা ‘এ আবার কি নতুন ঝামেলায় পরা গেলো’ গোছের প্রশ্ন। বোধহয়, আলি এইবারে তাঁর আলিশান মার্সিডিজ ট্যাক্সি ভাড়া বাবদ কত পাউন্ড তাঁর স্বামীর কাছে চেয়ে বসবেন, সেটাই তাঁর তখন একমাত্র জিজ্ঞাস্য। আমিও যে সামান্য ভয়াতুর হয়ে পরিনি, তা নয়। ভাবছি পার্সোনাল লোনের এজেন্ট ছেলেটিকে একটা ফোন মেরে দেখব কিনা; তখন আমাদের পালকিই তাঁর বাপ মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, চিন্তা কোরোনা, ট্র্যাভেল এজেন্ট মেয়েটা বলেছে, এটা প্রিপেড, পোস্টপেড নয়। পালকির সেই প্রতিশ্রুতি পেয়েই, তৎক্ষণাৎ আমরা কর্তা-গিন্নি পুনরায় উদ্দীপিত হয়ে আলির সাথে খোশমেজাজে গল্প জুড়ে দিয়েছি।
আলির আদি বাড়ি রাওয়ালপিন্ডি (উনি অবশ্য ছোটো করে বললেন, পিণ্ডি)। ষাটের দশকের মাঝামাঝি, আলির বাবা-চাচারা গোটা পরিবার মিলে পাকিস্তান ছেড়ে, ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি দিয়েছিলেন লন্ডন। ইদানীং আলিরা থাকেন হউন্সলো’তে। নিজের বাড়ি কিনে নিয়েছেন, আর এখন একেবারে পাকাপাকি ব্যবস্থা। পাকিস্তান তাদের যাওয়া হয়নি, তা প্রায় পনেরো বছর হতে চলল। এদিকে আলির মুখে পিণ্ডি শুনেই কিনা জানিনা, আমাদের ছোটোটি আর তার মা বোধহয় একটু অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। জঈশ মহম্মদের বা লস্করই তইবার হয়ে আলি আমাদের এই চারজনের উপরেই বালাকোটের বদলা নেবেন কিনা, সেই সন্দেহই হয়ত তাদের মাথায় তখন ঘুরছে।
সেই ধাঁধাটা কাটাতেই আর আমি যে একসময়কার নিয়মিত লন্ডনার, সেই বিষয়টা বিশদে বোঝাতেই, আলির সাথে ফেঁদে বসলাম ফেলথাম’এর পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ ‘লাহোরি কড়াই’ এর গল্প। আর একথা সেকথায়ে জানতে পাওয়া গেলো, সে রেস্তোরাঁটি নাকি আলিরই চাচাতো ভাইদের। তারাই সাফল্যের সঙ্গে চালাচ্ছেন বিগত বিশ বচ্ছর। আর এখন তো নাকি সে রেস্তোরাঁর অনেক কটি টেক অ্যাওয়ে ব্রাঞ্চ’ও নাকি খোলা হয়ে গিয়েছে। আমাদের বিলেতে থাকাকালীন, সময় সুযোগ পেলে, আলিসাহেব নেমন্তন্নও জানিয়ে রাখলেন ফেলথাম এসে, একদিন লাহোরি মটন রোল খেয়ে যাবার।
এতক্ষণ মার্সিডিজ চলছিল প্রায় একশো মাইল বেগে। অর্থাৎ হাইওয়ে। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছে, কিন্তু বাইরে তখনও বেশ উজ্জ্বল আলো। আর সেটাই বুঝি পালকি দেখছে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে আর নিজের ফোনের উইকি থেকে জেনে নিচ্ছে, সামার সলিস্টিস জিনিসটা কি? স্পিড কমল গাড়ীর। দোকানের সাইনবোর্ড পড়ে জানলাম, আমরা পৌঁছে গিয়েছি চেলসি। অর্থাৎ কেন্সিংটন’এর কাছেই। বেশ দুচারখানা পানশালা তখনও খোলা। বাইরে ছোটখাটো জটলা। একটা ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ী থামার পর, বাঁদিকে ঠাহর করে দেখি একটা ছোট্ট বোর্ডে লেখা রয়েছে – রয়্যাল বোরো অফ কেন্সিংটন অ্যান্ড চেলসি। আর তাঁর পাশেই ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডন। বুঝলাম, আমরা নির্বিঘ্নে আমাদের হোটেলে পৌঁছে গিয়েছি।
চলবে…
Leave a comment