বিলিতি পাউন্ডের সঙ্গে পকেটে শ’তিনেক দিরহাম পকেটে নিয়ে যাওয়ার কথা, বন্ধু অমিতাভ সাহা কিন্তু বারবার কান কামড়ে বলে দিয়েছিল। আর ঠিক সময়ে, তাঁর সে প্রস্তাব শুনিনি বলে, শেখেদের বিমানবন্দরে এসে পরতে হল হালকা আর্থিক ঝামেলায়। অবশ্য তার জন্যে দায়ী দুবাইয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর আমার অনাবশ্যক কড়া সতর্কবাণী। যেটা কিনা আজকে ফলেনি একেবারেই। ছুটি শুরুর আগে, অ্যাদ্দিন ধরে মেয়েদের ও তাদের মা’কে বার চল্লিশেক দুবাইয়ের যাচ্ছেতাই জটিল সিকিউরিটি চেকের গল্প শুনিয়েছিলাম উঠতে বসতে। এমনকি এও বলে রেখেছিলাম, দরকারে জামাপ্যান্ট ধরে টানামানি করতেও ঘাবড়াবেনা দুবাইয়ের সাঙ্ঘাতিক পুলিস। আমাদের টেররিস্ট প্রমাণ করে দেবে যেকোন সময়ে। আর সে চিন্তায়, তিন নারীই যে এরোপ্লেন থেকে নামার পর, খানিকটা হলেও স্নায়ুচাপে ছিলেন, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল বেশ। এই বুঝি ইমারতি পুলিসের দল মাস্তানি শুরু করে একটা জুতসই থাপ্পড় কষিয়ে দিল গিন্নির গালে! আমি হাঁটছি আর আড়চোখে দেখতে পাচ্ছি, ছোটজন এদিকে বেশ ঘেমে নেয়ে উঠেছে। ভাবছে, অপমানিত যখন তাঁদের হতেই হবে এবার করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে! তবে সবের মধ্যে ছোটটির হাঁটা দেখলাম কেমন একটা শ্লথ আর অনুগত রকমের হয়ে গিয়েছে! তারপরে সেই বিখ্যাত চেকিং ব্যাপারটাই একদম নির্ঝঞ্ঝাটে নির্বিঘ্নে মিটে যাওয়াতে, তিন জনের মধ্যেই এখন দেখা যাচ্ছে একটা অদ্ভুত অসংশয়ী প্রত্যয়। আর তারপরেই, একটু অগোছালো হাঁটাচলা, আত্মপ্রত্যয়ে নিজেদের মধ্যে অকারণ হাসাহাসি আর মাঝেমধ্যেই ‘এ আবার এমন কি?” গোছের একটা মুখচোখ। মনে হয় এগারো সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর সচিন তেন্ডুলকর ভারতের পতাকা জড়িয়ে ওয়ানখেড়ে স্টেডিয়ামটা একটু পায়চারি করতে বেরিয়েছেন।
ব্যস, এবারে সেই অধিক প্রত্যয়ের জন্যেই কিনা জানিনা, তিনজনেই ভরপেট বিমানের খাবার খাওয়া সত্ত্বেও, একটা কাউকে কেয়ার করিনা গোছের মুখ নিয়ে ঘোষণা করলেন, তারা এবারে নাকি শেখেদের দেশের কফি পান করবেন আর তার সাথে সামান্য কিছু স্যান্ডউইচ আর স্বাস্থ্যকর কিছু স্যালাড। লন্ডনের বিমান ছাড়তে তখনও আমাদের ঘণ্টাতিনেক বাকী। তাই তাঁদের আর দোষ দেই কিভাবে? একটু খাইখাই ব্যাপারটা তো আমাদের রক্তেই রয়েছে। সুযোগ বুঝে কনিষ্ঠাটি তো কোন একটা সাতমহলা দোকানে গিয়ে মেনুকার্ড দেখেও এসেছে। ফিরে এসে বলল বাবা, “কোন প্রবলেম নেই, সব মিলিয়ে মাত্র টু ফিফটি টু থ্রী হান্ড্রেড মতন খরচ হবে আমাদের”। কিন্তু মুশকিল হল বাচ্চাটি কি আর জানে, এ আমাদের গান্ধীর ছবির টাকা নয়! এ জিনিষ উচ্চবর্ণের দিরহাম। মেয়েটি কি আর জানে এদিকে তার বেচারা বাপের মনে যে অবিরত চলছে উনিশ ঘরের নামতা? তবে সে খেয়াল করার মতন পরিপক্বতা মেয়েদের মধ্যে দেখা গেলো রেস্তরাঁয়ে বিলটা মেটানোর সময়ে। মাত্র চারটে কফির দামই প্রায় হাজার দেড়েক ছাড়িয়ে যেতে, মহিলারা প্রত্যেকেই তখন যারপরনাই আঁতকে উঠেছেন… তারপরে আবার একশো সওয়াশো দিরহামের পানসে সবজির স্যালাড। আরে, সবই তো আর স্মার্টফোনের ফটো তোলার মতন ফ্রি নয়।
ছত্রপতি শিবাজী থেকে দুবাইয়ের বিমানে ভারতীয় বা এশিয়ানদের সংখ্যাই ছিল অধিক। লন্ডন গ্যাটউইকের বিমানে চড়তে গিয়ে দৃশ্যপট গিয়েছে আমূল বদলে। প্রায় সব যাত্রী-পর্যটকেরাই যারা গেটের সামনে গম্ভীর মুখে অপেক্ষা করছেন, অধিকাংশই সেখানে সাদা চামড়ার সাহেব আর মেম। গোটা কুড়ি পঁচিশ ব্রিটিশও রয়েছেন, হাতের পাসপোর্টে বাঁকা বাঁকা অক্ষরে লেখা ইউনাইটেড কিংডম! কিন্তু তাঁদের হাবভাব আবার আমেরিকানদের চেয়েও উপর – পড়া। কেমন একটা যেন উদ্ধত বেপরোয়া হাঁটাচলা। আসলে বুঝি বাড়ী ফিরছেন তারা। কনফিডেন্সই আলাদা রকমের! দুবাইয়ের বেঞ্চিতে বসাতেই যেন সেই বিমানবন্দরের বেঞ্চিটাই ধন্য হয়ে যাচ্ছে তাঁদের নিতম্বের ছোঁয়াতে। আসলে তাঁদের জীবনে আর সমস্যাটা কোথায়? আমাদের মতন অনবরত উনিশের ঘরের নামতা মুখস্থ রাখতে হয়না কিনা! যাকগে, এমনিতে হয়ত কিছু করতে পারবনা এদের, তবে ব্যাটাদের দেখে নেব ওয়ার্ল্ড কাপের মাঠে! ব্যাপারটা তাই সঁপে দিলাম বিরাট কোহলী’র হাতে।
তবে বিমানে উঠে খুব কাছ থেকে বিমানের ভিতরের বাকী লোকজনদের এতক্ষণ ধরে দেখলাম। আর সবচেয়ে অসংস্কৃত বিষয়টা চোখে পরল, এঁরা এঁদের বাচ্চাদের বিন্দুমাত্র শাসন করেন না। বাচ্চারা তাদের মর্জিমাফিক যেখানে খুশী সেখানে চলে যাচ্ছে, গলার শির ফুলিয়ে বেকার চেঁচাচ্ছে, মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে, জুতোর ফিতে খুলে মুখে চালান করে দিচ্ছে অনায়াসে, অন্য ঘুমন্ত লোককে গিয়ে বিরক্ত করে আসছে বেমালুম, কিন্তু এঁদের মধ্যে তার জন্যে কোনপ্রকারের ভ্রুক্ষেপ লক্ষ্য করলাম না। কথা বলেই চলেছেন অনর্গল। এদের মা’রা বুঝি তাঁদের স্বামীকে পিটিয়েই ক্লান্ত, তাই হয়ত বাচ্চা পেটানোয় আর কোন ইচ্ছে নেই। হয়ত ফিরছেন নিজের বাড়ি, সুদূর লন্ডন বা আমেরিকায়ে। এশিয়ান যারা আছেন, তাঁরা বিমানে ওঠার আগে শেষ মুহূর্তের কথা সেরে নিচ্ছিলেন, লুধিয়ানায়ে বা লাহোরে তাঁর ভাইয়ের দিশী বউটার সঙ্গে। বুঝিয়ে বলে দিচ্ছিলেন হয়ত, তাঁকে উপহার দেওয়া ওই ব্যাগটা কিন্তু অরিজিনাল গুচি কোম্পানির। লিঙ্কিং রোডের নকলি চিনে মাল নয়!
গ্যাটউইকের বিমানে বসে, যখন বড়টি ম্যাপে, কনিষ্ঠাটি নিজের মোবাইলে, আর তাঁদের মা পিঠ আর পা ব্যাথায়ে কাবু হয়ে ঝুঁকে পরেছেন আমার দিকে, আমি ভাবছি, যেন পরের জন্মে একটা সাহেব হয়ে জন্মাই। কিমবা এমন কোন সচ্ছল ভারতীয় যে কিনা একদম অপরাধবোধহীন হয়ে বাপ-মা’কে কলকাতায় ফেলে রেখে বাসা বাঁধবে আমেরিকায়ে। সারাদিন সত্তর বা নব্বই ঘরের নামতা মুখস্ত করার চেয়ে, দেশে ফিরে আসবে দু’তিন বছর বাদে বাদে। আর সঙ্গে করে নিয়ে আসবে একগাদা সস্তার চকোলেট ঘড়ি ব্যাগ টেপ রেকর্ডার পারফিউম আর সোয়েটার। ছেলেমেয়েগুলো বাংলা না শিখে কেবলমাত্র ইংরিজিতে ফটর ফটর করবে। আর কলকাতা ফিরেই মিনারেল ওয়াটারের বোতল গলায় ঝুলিয়ে বিবৃতি দেবে, উফ কি গরম অথবা কি ন্যাসটি শহরটা গো তোমাদের!
এসব ভাবতে ভাবতেই আর পাশের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বাচ্ছাটির ক্রমাগত অসভ্যতা দেখতে দেখতে কখন যে সাড়ে ছয়ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে ঘড়িতে, টেরই পাইনি ভালোরকম। এই সাড়ে ছয় ঘণ্টায়ে বেশ কয়েকবার ইচ্ছে করেছে বাচ্চাটির সোনালি চুলগুলি মুঠো করে বেশ ঝাঁকিয়ে দেই একবার, কিন্তু তার দীর্ঘাঙ্গিনী তরুণী মা’টিকে দেখে সাহস করে উঠিনি। বাইরে তখনও বেশ রোদ, কিন্তু গ্রিনউইচ মিন টাইম বলছে, ঘড়িতে নাকি মাত্র সন্ধ্যে সাড়ে আটটা! পালকি অস্ফুটে বলল, বাবা! আর মিনিট কুড়ি বাদেই ল্যান্ড করব আমরা লন্ডন গ্যাটউইকে। বুঝলাম, মেয়ে আমার বড় তো ছিলই, আরও বুঝি বড় হয়ে গিয়েছে একবেলাতেই। মনে মনে বাচ্চাটির মা’কে দুটি বাছাবাছা বাংলা গালি দিয়ে বেঁধে নিলাম সীটবেল্ট… এবার তো আর উনিশ নয়, এবারে তো শুরু হবে নব্বই দিয়ে গুন করবার পালা!
চলবে…
Leave a comment