হায়না তো চায়নায়ে মশাই ৩ – ছুটির শুরু

আমার বাবা নিজে ছবি তুলতে ভালবাসতেন খুব। আমরা বেড়াতে গেলেই ফুলের বাগানে বা পুরীর বিছে তাঁর ছেলে বউয়ের ছবি তুলে তিনি একসময়ে বেশ বিখ্যাত ছিলেন। আমার সে রোগ কোনদিন ছিলোনা। বেড়াতে গিয়ে দু-রিল ছবি না তুলে, দু দিস্তে হাবিজাবি পদ্য লেখাই ছিল আমার বদভ্যাস। তবে ক্যামেরা দেওয়া মোবাইল ফোন কেনার পর থেকেই বেড়াতে যাওয়ার ছবি তোলার রীতি ও হিড়িক আমার বেড়ে গিয়েছে খুব। আজকাল কোথাও একদিন দুদিনের জন্যে অবকাশ কাটাতে গেলেই, ডান-বাঁ মিলিয়ে প্রতি মুহূর্তে গোটা আটেক ছবি না তুলতে পেলে, যেন তৃপ্তি হয়না পুরো। এটি কিন্তু সোজা বাঙলায়ে একধরনের ব্যামো বলে আর তার কয়েকটি মনস্তত্ত্বিক ব্যাখ্যাও রয়েছে ইন্টারনেটে। প্রথমত, আজকের দিনে মোবাইলে তোলা ছবি একেবারে ফ্রি। তোলো তুমি যত খুশি, যত চাও। আর তারপরেই দাও ঢেলে তুমি ওয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, টুইটার আর ইন্সটাগ্র্যামে। আর দেখতে হবেনা, মুহূর্তে চালু হয়ে যাবে পাবলিকের টীকাটিপ্পনী। দ্বিতীয় কারণটি ঐতিহাসিক ও আরও নির্মম ভাবে মনস্তাত্ত্বিক। সেই নব্বইয়ের শেষাশেষি, প্রথমবার মার্কিন দেশ সফরের সময়, সামনের প্রতিবেশী সরকার জেঠুর থেকে ধার করে নেওয়া ইয়াশিকা ক্যামেরাটি ব্যবহার করা যায়নি, ওই ছত্রিশটি ক্লিকের পর। পুরো ফিলাডেলফিয়া শহরটা একরকম চষে ফেলেও, ওরম কালো কৌটোয়ে ভরা কোডাক ফিল্ম কিনতে পাওয়া যায়নি, যেমনটা কিনা পাওয়া যেতো গোলপার্কের ফোটোফেয়ারে। সে দেশে তখন থেকেই হইহই করে চালু হয়ে গিয়েছিলো চ্যাপ্টা ডিজিট্যাল ক্যামেরা। সে কারণেই ছুটিতে বেড়িয়ে, আজ হাত নিশপিশ করে বুঝি মুহূর্তগুলিকে আটকে রাখতে? তবে যে যাই বলুক না কেন, আধুনিক দিনের স্মার্টফোন কিন্তু কিছু না হলেও, না চাইতেই একটা ক্ষিপ্ত সাম্যবাদের ব্যবস্থা করে দিয়েছে ভারতবর্ষে।

বেলা সাড়ে দশটায়ে দুবাইয়ের বিমান। এমিরেটস কোম্পানির। আর তার আগেই, এয়ারপোর্টেই, ছুটির উচ্ছৃঙ্খলতা চালু হয়ে গিয়েছে অন্যরকম ভাবে। তবে দোষ কি তাতে? নয়ত কি প্রাতরাশে, চারটি মেদপ্রবণ মানুষের পরিবার, কেএফসি থেকে বিনাবাক্যব্যয়ে আটখানা ডুবো তেলে ভাজা মুরগীর মাংস কিনে নিতে পারে? যা দৈনন্দিন জীবনের নিয়মানুবর্তিতা, সংযম, অভ্যাস, সেই নিয়ম সেই শিকল ভাঙতেই তো ছুটি নেওয়া। এ যেন বউ বাড়ীর বাইরে গেলেই সামনের বাড়ীর বৌদির সাথে হালকা পরকীয়া করে নেওয়া! আর তার সাথে স্মার্টফোনের ক্যামেরায়ে ফ্রি’তে ছবি উঠছে মুহুর্মুহু। ছোটো কন্যাটি ক্যামেরার সামনে মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন অঙ্গবিক্ষেপ করে দাঁড়িয়ে পড়ছে, আর তার বাবার মোবাইল ফোন চলছে অবিরাম। আর তার সাথেই অনুক্ষণ চলছে তার বড় দিদিটির শাসন। বাবা আর তাঁর ছোটোমেয়ের অপিরিমিত হোলসেল ফটোগ্রাফিক সোল্লাস তার পছন্দ হচ্ছেনা একেবারেই। তবে ছোটকন্যা খুশ! এতো সৌভাগ্য সে কোথায় ধরে রাখবে বুঝতে পারছেনা!

মুম্বইয়ের বিমানবন্দর তো আমাদের মোটামুটি সকলেরই পরিচিত আর তাই বুঝি কৌতূহলটা সাড়ে দশটা অবধি বেশ কমই ছিল। খানিকটা পরে বোর্ডিং করেই, দুবাইগামী এমিরেটসের বোইং ট্রিপল সেভেন জাম্বো জেট বিমান যে কতটা বড়, কতটা আড়ম্বরপূর্ণ হতে পারে, সে বিষয়ে সম্যক ধারণা ছিলোনা কন্যাদ্বয়ের। তবে এ কিন্তু তাদের গরীব বাবারই অক্ষমতা। আগে কয়েকটা এদিক ওদিক বেড়াতে গেলেও, এই প্রথম তারা চাপছে ইন্টারন্যাশনাল এরোপ্লেনে। আর দুজনেই তখন তারা এতোটাই বিস্মিত, চমকে গিয়েছে এতোটাই, সীট বাছাবাছি নিয়েও দুজনের মধ্যে মন কষাকষি হলনা তেমন একটা কিছু। বরং সামনের টিভি স্ক্রিনের ম্যাপ, টাইম জোন, আর বিভিন্ন দেশের মিউজিক আর সিনেমার সম্ভার দেখে তারা তখন এককথায়ে উত্তেজিত ও অধীর।

দুগগা দুগগা করে বিমান ছাড়ার অব্যবহিত পরেই মেয়েরা আর তাদের মা মহিলাটি ততক্ষণে ডুবে গিয়েছে এরোপ্লেনের এন্টারটেনমেন্ট সিস্টেমে। কানে গুঁজে নিয়েছেন ফ্যাশানের ইয়ারফোন আর আড়চোখে দেখতে পাওয়া গেলো, তাদের মা একটি হালকা গোছের সিনেমা দেখা শুরু করলেন। মুখে এমন একটা ভাব যেন এখুনি বলবেন, “আর ফিরছিনা বাপু, এবার কেষ্টা’কে নিয়েই থাকো।” আমি তখন মনোযোগ সহকারে নজর করে চলেছি আমার বাঁদিকের আইল সীটে বসা বিদেশিনী প্রৌঢ়া মহিলাটিকে। তাঁর পাশেই যে টকটকে লাল রঙের জামা পরিহত একমাথা পাকাচুলের ভদ্রলোক, উনিই কি এই বয়স্কা নারীটির স্বামী? আচ্ছা ওঁরাও কি আমাদের মতন দুবাই হয়ে লন্ডন যাচ্ছেন? ওঁরা কি ব্রিটিশ? নাকি ফরাসি দেশের লোক? সামনের সারিতে যে মেয়েটি তাঁর পাশের লোকটির সাথে খুব হেসে কুটোপাটি হয়ে গল্প করছে, সে কি তবে তাঁর ভাই? বাপের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল বুঝি মুম্বই’তে? আচ্ছা! সে কি ভারতীয় নাকি পাকিস্তানি? আমার পেছনের লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছিল মানুষটা বোধহয় কিউবা দেশের লোক। কেমন ফিদেল ক্যাস্ট্রো ধরনের মুখ চোখ তাঁর। আর তামাটে দাঁড়ি। আচ্ছা লোকটা কি চুরুট খায়? কি লিখছে সে? সেও কি আমার মতন বিমানে উঠলেই হাবিজাবি পদ্য লেখে?

এইসব অর্থহীন কথা ভাবতে ভাবতে হয়ত চোখ দুটো লেগে গিয়েছিলো খানিক। স্বপ্ন দেখছিলাম একটা। দেখলাম একটা ছবির দেশ। আর আমি সেই দেশের একটা বাগানে বসে, আমার নতুন কালো ছাতাটা মাথায়ে দিয়ে, চুপচাপ একের পর এক পদ্য লিখে চলেছি নির্বিকারে।

চোখটা যখন খুলেছি, তখন নিচটা বেশ দেখা যাচ্ছে। অনেকটা কাছে থেকেই আর সে রং তখন নীল বদলে উজ্জ্বল হলদে। এতো পুরো সিলেবাসের বাইরের প্রশ্ন। বালি। আর বিমানের গতিও দেখলাম তখন অপেক্ষাকৃত কম। বিমানে ক্যাপ্টেন একটা দ্রিমি দ্রিমি আরব্য মিউজিক চালিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে দুজন আর তাদের মা’কে একপলক দেখে নিলাম। ক্লোজ আপে তুলে নিলাম তাঁদের একখানা ছবি আর ভাবলাম, আরে! আমাকে তো এখন আর পদ্য’র খসড়া লিখলে চলবেনা। সামনে আমার অনেক কাজ। ডায়েবাঁয়ে চোখ বুলোচ্ছি আর ঠিক তখনই আমাদের ক্যাপ্টেন সীটবেল্ট বেঁধে নিতে হুকুম করলেন। আমাদের বিমান হেলেদুলে দুবাইয়ে অবতরণ করতে চলেছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর ঘড়িতে এখন বেলা সাড়ে বারোটা।

চলবে…

Leave a comment