সকালে হোটেলের নিচে সেই একই জায়গায় আল – মাদিদের সঙ্গে ফের দেখা। আজও তাঁকে দেখা গেল, সিগারেটে শোঁ-শোঁ করে টান মেরে বেগ আনছেন বুঝি! আর সেই করে-করে, বেচারা কিন্তু আজ বেশ উপদ্রুত। কপালে একদম বেশ কটি ভাঁজ পরে গিয়েছে। মাদিদের সঙ্গে মাত্র একদিনেরই আলাপ, তাও সে আবার মিনিট পাঁচেকের ধুমপানের সুত্রে, নইলে ঠিক জিজ্ঞাসা করে নিতাম ভদ্রলোকের কোষ্ঠের সেরকম কোন প্রবলেম আছে কিনা। আরে, আমাদের মতনই তো বয়স হবে তাঁর, হয়তো বা একটু কমসমও হতে পারে। আর এই বয়সেই তো শুরু হয় এসব ব্যাধি। আহারে! আমাদের তহবিল থেকে দু চামচে কব্জ-হর দিলে হয়ত’বা একটু আরাম পেতেন মাদিদ। আচ্ছা, ওমানে বা কাতারে কি ইশবগুল গোছেরও কিছু পাওয়া যায়না? ধনী দেশ বলে কেবলই পেট্রোল আর ডিজেল?
পূর্বেই বলেছি, ব্রেকফাস্টটা এ হোটেলে একেবারেই সাধারণ। আর আমাদের ছোটোজন, সে তার কেতাদুরস্ত দিদিটির মতন ব্রেকফাস্ট খেতে পছন্দও করেনা একেবারেই। একেবারে তার কাকার মতন! তাছাড়া প্রাতরাশের ডিম ভাজাতেও নাকি আঁশটে গন্ধ পেয়েছে সে। তবে ‘না-খাওয়া’ নিয়ে দুশ্চিন্তা আমাদের চারজনের মধ্যে নেই বললেই চলে! ছোটোটির প্রাতরাশে উপোস নিয়ে সামান্য দুর্ভাবনা দেখাতেই, গিন্নি চোখ টিপে গতকাল রাতের সেই ভারতীয় রেস্তরাঁয়ে নানরুটি আর চিকেন-টিক্কার পরিমাণটা কেবল মনে করিয়ে দিলেন। বাংলাদেশী ওয়েটার ছেলেটি – মাহরুফ, সহজেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন, চারজনের মধ্যে আসল খাইয়ে কেডা?
প্রথম গন্তব্য হোটেলের থেকে অদূরেই, ন্যাচারাল হিস্ট্রির মিউজিয়াম। টিকিট কাটার মাথাব্যাথা নেই, কারণ মিউজিয়ামটি সকলের জন্যেই সারা বছরই একদম ফ্রী। অকৃত্রিম একটা সুবিশাল রোমান স্থাপত্য। কড়া কিউরেটররা বেগুনী জ্যাকেট পরিধান করে তদারকিতে ব্যস্ত। আমাদের সাথে সাথে প্রায় গোটা পাঁচশো ইশকুলের বাচ্চাকাচ্চা না থাকলে, অমন গুরুগম্ভীর জায়গায়ে তো একটু ভয় পেয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। প্রবেশপথেই একটি পেল্লায় নীল তিমির কঙ্কাল ঝোলানো রয়েছে। ঢুকেই, বোঝা গেল এ জাদুঘরের কিন্তু জাতই আলাদা। মেইন হলেই, ডানে কোটি বছরের পুরাতন স্টেগোসরাস, বাঁয়ে দাঁতাল টি-রেক্স, সামনে সুবিশাল জিরাফের কাঠামো আর দু’পা এগোলেই অতিকায় অন্য কোন স্তন্যপায়ী জীব। প্রতিটি প্রদর্শিত বস্তুর পাশ ঘেঁষে, তাঁদের বৈজ্ঞানিক বিশদীকরণ। যা কেবলমাত্র বুঝবেন জিওলজি’র ছাত্রছাত্রীরা অথবা আমার গিন্নি। মিউজিয়াম দর্শনের প্রথমদিকটা মোবাইলে ছবিটবি তুলেছিলাম বেশ কিছু। খানিক পরেই যখন দেখা গেল, প্রায় কোনকিছুরই অর্থোদ্ধার করা যাচ্ছেনা, ঠিক তখনই ধূমপানের নেশায় বেরিয়ে আসতে হয়েছে। আধঘণ্টা খানেক পরেই গিন্নি তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে বেরিয়েই বললেন, “তুমি কি বোকা নাকি? অ্যাদ্দুর এসেও, ডারউইন সেন্টারটা দেখলেনা”? আমিও মুহূর্তে একটা কাঁচা ঢপ দিয়ে বলে দিলাম, “ও জিনিস আমার অনেক আগেই দেখা”।
স্নায়ুচাপে ভুগলেই দেখেছি, গিন্নি আমার সাথে ঈষৎ আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। জাদুঘর থেকে বাইরে বেরিয়েই, ওঁর দু-তিনটে ফটো তুলবার আর্জি জানাতেই, খামোখা মুখঝামটা দিচ্ছেন দেখা গেল। কন্যাদ্বয়কেও দেখলাম একটু কম সক্রিয়। অর্থাৎ মাটির উপরে এরা একরকম আর নিচের পাতাল রেলে ঢোকার ব্যাপারে সামান্য হলেও, তিনজনেই পীড়িত আছেন বুঝতে পারা গেল। গত দুদিন পালকিই নেতৃত্ব দিলেও, মিউজিয়াম পরবর্তী কর্মসূচিতে, পথপ্রদর্শনের মুখ্যভূমিকা যে তার বুড়ো বাপকেই পালন করতে হবে, সেটা বুঝে নেওয়া হল। আর সেই অনুসারে, খোদ লন্ডনারদের মতন আত্মবিশ্বাসী পায়ে এস্কেলেটর দিয়ে তিনটি নারীকে কোনরকম ভেবাচেকা খাওয়ার সুযোগ না দিয়ে, এক্কেবারে সটান ভূগর্ভে।
সাউথ কেন্সিংটন স্টেশন থেকে, কোনওরকমের সমস্যা ছাড়াই, প্রিপেড ট্র্যাভেল কার্ডটা ব্যবহার করে, স্টেশনের ভেন্ডিং মেশিনে, রীতিমতন অনায়াসে চারখানা আনলিমিটেড ট্রেনযাত্রার টিকিট কিনে ফেলার পর, গিন্নি দেখলাম বড়টির কাছে স্বামীর বিলিতি প্রযুক্তিজ্ঞানের তারিফই করছেন।
একবার বুঝে গেলেই, লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডের কিন্তু মজাই আলাদা। এমন সহজবোধ্য আর সাবলীল ভাবে কালার কোডিং করে আন্ডারগ্রউন্ডের নক্সা করেছেন সাহেবরা, যেন আমার সত্তরোর্ধ বাপ- মা’কেও একা ছেড়ে দিলে, তারাও বাকিংহ্যাম থেকে বেমালুম চা-পান করে স্বচ্ছন্দে ফিরে আসতে পারবেন। রেলের ভিতরে যখন কানে হেডফোন গোঁজা জনৈক মেম যাত্রীকেও নক্সা জরিপ করতে দেখা গেল, তখনই মা আর তাঁর দুই কন্যা দেখলাম, ধরে ফেলেছেন ছকটা। পালকিই দেখলাম ইশারা করল তাঁর বোনটিকে আর মা’কে… দরজার কাছে এসে দাঁড়াও, এর পরের স্টেশনটাই পিকাডিলি সার্কাস।
রেল এসে দাঁড়িয়েছে স্টেশনে। পিকাডিলি সার্কাস স্টেশন… আর কোথা থেকে কে যেন একটা ললিত কণ্ঠে পইপই করে সাবধান করে বলে উঠলেন, প্লিজ মাইন্ড দি গ্যাপ বিটউইন দ্য ট্রেন অ্যান্ড দ্য প্ল্যাটফর্ম”।
চলবে…
Leave a comment