হায়না তো চায়নায়ে মশাই ১১ লন্ডন প্রথম দিন (৬) • জুন ২০১৯

ছুটিতে বউ মেয়েদের নিয়ে বিলেত বেড়াতে এসে, অবকাশের সকল বিস্তারিত বৃত্তান্ত গল্পের আকারে ট্র্যাভেলগ করে লিখে রাখাটা, কিন্তু বেশ শ্রমসাধ্য আর দুস্কর। তাছাড়া ছন্দ-মেলানো মজার পদ্য আর রীতিমতন ভ্রমণ আখ্যায়িকা – এই দুটো কিন্তু কোনমতেই এক নয়। তবুও, এদেশে অনেককাল পরে পরিবারসমেত বেড়াতে এসে, চারিপাশে যা দেখছি, যা শুনছি, সবই কেমন যেন নতুন ঠেকছে আর সবেতেই কেন জানিনা একটা বিচিত্র শিশুসুলভ উত্তেজনা হচ্ছে। মানুষ দেখছি হরেকরকম। নারী পুরুষের বিস্তর জমায়েত। বহুসংখ্যক দোকান, বাজার, ফুলের বাগান, মাঠ। লন্ডনের রাস্তায়ে বাকী সকলের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে গিয়ে, ফোস্কা সামলেও, বিস্মিত হয়ে পড়ছি ভিন্ন রুচি, ভিন্ন কৃষ্টি, মানুষের ভিন্নরকম চালচলন দেখে। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মিছিল করে আসা অজ্ঞ এক ভাগচাষীর মতন দুচোখ ভরে দেখে নিচ্ছি লন্ডন শহরের চরম শহুরে ব্যবহার। আর এই উত্তেজনা, এই শিশুবৎ কৌতূহলই বুঝি ছাইভস্ম লিখে রাখতে যোগাচ্ছে প্রেরণা।

ভ্রমণের গল্প লিখে রাখতে গেলে কিন্তু কেবল জায়গার বিবরণ আর বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় তথ্য লিখে গেলে, সেটি হবে একটি ব্যর্থ গাইডবুক। এই’তো সবেমাত্র ঘণ্টাখানেক আগেই টেমস নদীর উপর, ষ্টীমারে চেপে এলাম। হোমস সাহেবের বাড়ী হয়ে, আমাদের পৌঁছনোর আগেই কিন্তু তখন টাওয়ার অফ লন্ডন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তাই আর সময় নষ্ট না’করে চলে আসা গেল টেমসের ঘাটে। একটা পেল্লায় সাইজের জলযানে কেবলমাত্র সারেঙসাহেব, তার সহকারী একজন যুবক আর আমরা চারটি মাত্র প্রাণী। কোন জেটি থেকে উঠলাম, কোন জেটিতেই বা ফিরলাম, সেসব খেয়াল নেই আর সেসব তথ্য দেখলাম সত্যিই গৌণ। কারণ টেমসের কালো জলে, কোন আবেগ খুঁজে পাওয়া যায়নি। গঙ্গাবক্ষে যতবারই চড়া হয়েছে নৌকোয়, নিজের অজান্তেই কেন জানিনা, মুখে অনায়াসে এসে গিয়েছে ভাটিয়ালী গান… রসিক নাইয়া! কউনবা দ্যাশে যাওরে তুমি, সুয়াই গাঙ বাইয়া? তবে সে গান টেমসের উপরে থাকার সময়ে একবারের জন্যেও মনে এলনা কেন? সে নদীতেও তো গঙ্গার মতন স্রোত যথেষ্টই ছিল, উজানগামী স্রোত। আচ্ছা, আমাদের এই চারজনের বদলে যদি, এই ষ্টীমারে, সুনীল, শক্তি, সন্দীপন, তারাপদ রায়েরা থাকতেন? শক্তি কি একবারের জন্যেও একটা রবিঠাকুরের গান গেয়ে উঠতেন না? বা একটা পল্লিগীতি? একবারের জন্যেও কি সুরার বোতলটা জলে ছুঁড়ে দিয়ে, সারেঙসাহেবের হাত থেকে স্টিয়ারিং হুইলটা কেড়ে ষ্টীমারটা চালিয়ে দিতে পারতেন না কটসওয়লড অথবা নর্থ সি’য়ের দিকে?

আমি ভাবছিলাম চাইবাসার কথা। আর এদিকে টাওয়ার ব্রিজ, লন্ডন ব্রিজ, মিলেনিয়াম ব্রিযের পর আরও গোটা পাঁচেক নাম না জানা ব্রিজের নীচ দিয়ে সফরের পর, আজ সকালেই ঘুরে যাওয়া ওয়েস্টমিন্সটার ব্রিজের জেটিতেই নেমে পরতে হল, ঘণ্টাখানেক নৌবিহারের পর। আর সেইখান থেকে গোল্ডেন ট্যুরসের রেড লাইন বাসে করে ফের গ্লস্টার রোডের পথে। ফেরার পথে এক মুহূর্তের জন্য দেখা পাওয়া গেল হাইড পার্কের। ঈশ কি সবুজ! কতদিন হয়ে গেল, একবারও ময়দানে যাওয়া হয়নি! এবারে একটা পুরো দিন, সকাল থেকে সন্ধ্যে ময়দানে বসে কাটাতে হবে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার আগে থেকেই নাকি বিদেশভ্রমন করেছিলেন প্রচুর। আর নোবেল প্রাপ্তির পরে তো বেশ ঘনঘনই তাঁকে যেতে হয়েছিল বিভিন্ন বিদেশসফরে। তাঁর ‘ইউরোপ প্রবাসীর পত্র’ বা ‘পথের সঞ্চয়’ বইগুলি পড়া নেই আমার। তবুও সব দেশ ঘুরে এসে, সেই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই তো আবার দেখতে বলে দিয়েছেন ঘরের সামনের শিশিরবিন্দুর কথা।

কেন্সিংটনের হোটেলটা অনেকটা শিয়ালদা স্টেশনের কাছাকাছি হোটেলগুলির মতন। ঘরটরগুলো তেমন অপরিচ্ছন কিছু না হলেও, এরকম ছোট্ট ঘরে, গত বিশ-পঁচিশ বচ্ছর থাকা হয়ে ওঠেনি। পালকিরা দুইবোনে তাও মোটামুটি একটা বড় ঘর পেয়ে গেলেও, আমাদের বরাতে জুটেছে সরু একচিলতে একটা অপ্রশস্ত ঘর। খাট বিছানা, বালিশ কম্বল আর জামাকাপড়ের একটা ওয়ার্ডরোব। দেওয়ালে কোনওরকমে ঝোলানো রয়েছে একটা টেলিভিশন। আর সেটাতে চ্যানেল বলতে, হাতে গুনে পাঁচটি থেকে ছটি। দুঃখের বিষয়, সে পাঁচটির কিন্তু একটিতেও কিন্তু ক্রিকেট খেলা দেখানো হচ্ছেনা। চা, কফি বানানোর গরম জলের কেটলি হোটেল থেকে একটা দিয়েছে বটে, কিন্তু তার সাথে মাত্র একটা করেই মাথাপিছু চা-পাতার ব্যাগ। বাথরুমে পানীয় জলের জন্যে, দুটো প্ল্যাস্টিকের গেলাস। পিপাসা পেলে, ওয়াশ- বেসিনের কল থেকেই জল নিয়ে নিতে হবে। কলের জল পান করাটা অবশ্য বিদেশে নতুন কিছু নয়।

ভ্যালু ফর মানি না পেলে, ভেবে দেখা গেল, এসবে আমাদের অসুবিধা তেমন কিছুই নেই। সারাটা দিন তো প্রায় বাইরেই কাটানো হচ্ছে। রাতের দিকে হোটেলে ফিরে এসে প্রয়োজন তো কেবল একটা বিছানার। আর গিন্নির মতে, সেটাই যখন পাওয়া গিয়েছে, তখন হোটেল নিয়ে ট্র্যাভেল এজেন্টের কাছে অসন্তোষ জানিয়ে হবে’টা কি? তাছাড়া যতটা বোঝা গিয়েছে, কেন্সিংটনের মতন জায়গায়ে কিন্তু থাকতে হলে, একটু আধটু ছোটোখাটো সমস্যা তো সইয়ে নিতেই হবে। হাতের নাগালে গ্লস্টার রোডের আন্ডারগ্রাউন্ড, একগাদা রেস্তোরাঁ, পাব, আরও কত কি! এই তো আজকেই যেমন টেমস নদীতে ষ্টীমার চাপার পর কেমন সুন্দর একটা ফিরতি রুটের নীল বাস ধরে ফিরে আসা গেল গ্লস্টার রোডের স্টপেজে। ফেরার সময়ে নান আর চিকেন দিয়ে খাওয়া সেরে নেওয়া হল, লাইট অফ ইন্ডিয়া রেস্তরাঁয়ে।

আজকের দিন শেষ। গোড়ালির ফোস্কাটা বেশ জবরদস্ত পড়লেও, কালকে আবার আছে নতুন প্ল্যান, নতুন সব জায়গায়ে পাড়ি দেওয়া। পালকিকে ম্যাপ ধরে ধরে আন্ডারগ্রাউন্ড চড়ানো আছে, আছে পিকাডিলি সার্কাসে বিকেলের চা পান করা, ট্র্যাফ্যালগার স্কোয়ারে ফটোসেশন, আর তার সাথেই আছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম আর নাচ্যারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম দেখা। এই সব ভাবতে ভাবতেই দিনের শেষ ধূমপানটা করতে ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে আবার হোটেলের নিচে নামা। একটি বিদেশিনী নারী ফিরে আসছেন হোটেলে। ব্রিটিশই তো মনে হল তাঁকে, নতুবা মার্কিনী! নারীটি সৌজন্যে, আমার দিকে চেয়ে মেমটি একটু হাসলেন বলেই তো মনে হয়েছিল। তার দিকে তাকিয়ে আমিও প্রত্যুত্তরে হাসতে গিয়ে কেমন একটা বিবর্ণ মতন হয়ে গেল মেয়েটির মুখখানা। আমি প্রাচ্য দেশের লোক বলেই কি এমন ব্যবহার?

চলবে…

Leave a comment