ফেলুদারা ছিল তিনজন আর আমরা চার। মাদাম তুসোর জাদুঘর দেখার পরেই নাকি তোপসে আর লালমোহনবাবু ফেলুদাকে অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু কোথায় যাওয়া হচ্ছে, সেটা ফেলুদা আগে থেকে তাঁদের কিছুই খুলে বলেননি। সত্যজিৎ লিখেছেন, “এখানকার অনেক রাস্তার নাম বড় বড় পাথরের ফলকে লেখা থাকে। একটুক্ষণ চলার পর সেইরকম একটা ফলক চোখে পড়ায় ব্যাপারটা এক ঝলকে বুঝে নিলাম। রাস্তার নাম বেকার স্ট্রিট। ২২১বি বেকার স্ট্রিটে যে শার্লক হোমসের বাড়ি সে কে না জানে? ওই নম্বরে যদিও সত্যি করে কোনও বাড়ি নেই। কিন্তু কাছাকাছি নম্বর তো আছে। ফেলুদা সেইরকম একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গভীর গলায় বলল, গুরু, তুমি ছিলে বলেই আমরা আছি। আজ আমার লন্ডন আসা সাৰ্থক হল”।
সেরকমই কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম আমাদের দলের বাকী তিনজনের সঙ্গে। আগে থেকে কিছু না বলেকয়ে নিয়ে যাবো হাঁটিয়ে আর অপ্রত্যাশিতভাবেই হুট করে সামনে যখন এসে পরবে ২২১বি বেকার স্ট্রিট, ফেলুদার ওই বিখ্যাত ডায়লগ’টা ঝেড়ে একটু হাততালি কুড়োবো ওঁদের থেকে, এটুকুই ছিল আশা। কিন্তু বাদ সাধল গিন্নির হাঁটুর ব্যাথা, আমার গোড়ালির আর বাচ্চাদুটি তখন খিদের জ্বালায়ে বেশ কাবু। চারটে বেজে গিয়েছে, এখন কিছু খেয়ে নেওয়াটাই জরুরি বলে মনে হচ্ছিল। অতএব, শার্লক হোমসের চমকটা না হয় একটু পরেই দেওয়া যাবে, আগে পেটপূজো। এই ভেবেই ঢুকে পরা গেল সামনেরই একটা চালু রেস্তরাঁয়ে। মাদাম তুসো থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে। নাম ব্ল্যান্ডফোর্ডস। বাইরে বড়বড় করে মোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে, ব্রিটিশ, ইতালিয়ান, মেডিটেরানিয়ান, ভেজিটেরিয়ান ফ্রেন্ডলি। ওই শেষেরটার লোভেই বুঝি গিন্নি আমার এককথায়ে রাজি। ভারতের বাইরে গেলে তিনি নাকি সেখানকার ম্যাগি ফুটিয়ে খেতেও একটা আঁশটে গন্ধ পান। ভেজি খাবার, সস্তাও হবে আর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে, সেটি গন্ধবিহীনও হতে পারে।
বিলেতের রেস্তোরাঁর একটি বিশেষ ব্যাপার হল তাঁদের বসার জায়গার ব্যবস্থা। প্রতিটি রেস্তোরাঁরই বাইরে থাকবে কমপক্ষে তিনটি থেকে চারটি টেবিল। ফুটপাথের উপরেই। আর চারিপাশে ছড়ানো ছিটনো চেয়ার। বাইরে রাখা প্রত্যেকটি টেবিলেই অবশ্য করেই থাকবে একটা করে অ্যাশ-ট্রে, তাতে উপচে পড়ছে সিগারেট, এদিক ওদিক ছাই আর নারী পুরুষেরা সেই বাইরের টেবিলে, কেউ দাঁড়িয়ে আর ভাগ্য ভালো থাকলে বসে, বীয়ার পান করে চলেছেন। ইউরোপের অনেক শহরেই ঠিক তেমনটাই ব্যবস্থা। এ’গুলোকে বলে ক্যাফে, এ সব জায়গায়ে বীয়ার পান করার সুব্যবস্থা থাকলেও, বিলিতি পাব বলতে ঠিক যা বোঝায়ে, তা কিন্তু এগুলো নয় মোটেই।
ব্ল্যান্ডফোর্ডসে জায়গা পাওয়া গেল নিচের তলায়। কাঠের একটি সিঁড়ি দিয়ে নেমেই, থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন পানীয় আর হরেক রকমের খাবার। অনেকটা আমাদের বুফে সিস্টেমে যেরকম দেওয়া হয়। একটি ট্রেতে প্লেট, চামচ, কাঁটা, ছুঁড়ি নিয়ে, উঠিয়ে নিতে হবে পছন্দের খাবার, ফ্রিজার থেকে বের করে নিতে হবে পছন্দের পানীয়। যত খুশি। তারপরে খাবারের কাউন্টারগুলির শেষে ক্যাশ কাউন্টার। সর্বশেষে সেইখানে প্রদত্ত বিল মিটিয়ে, তারপরে টেবিল চেয়ারে বসে খাওয়া শুরু। সব রেস্তরাঁয়ে অবশ্য এইরকম সিস্টেম নয়। হয়ত লাঞ্চের সময়ের ভিড় এড়াতেই এমনটা ব্যবস্থা রেখেছেন ব্ল্যান্ডফোর্ডস কর্তৃপক্ষ।
বিলেতে এসেছি, বিলিতি খাবার দিয়ে বউনী করার জন্যে আমরা বাপ মেয়ে ফিস অ্যান্ড চিপস নিলেও, ছোটজন আর তাঁর মা কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে, ঠোঁট কামড়িয়ে আর গন্ধ শুঁকে শেষ অবধি পাতে নিয়ে এসেছেন যথাক্রমে ভেজিটেবল লাসানে ও পাই। ফিস অ্যান্ড চিপসের সাথে একগাদা কড়াইশুঁটি দেখে পালকির সামান্য কৌতূহল হচ্ছে বুঝতে পেরে, তাকে বুঝিয়ে দেওয়া গেল ইংরেজদের কড়াইশুঁটি প্রীতির গল্প। অন্যদিকে সবজির পাই আর লাসানে, ব্ল্যান্ডফোর্ডস দোকানটি যে একদম ঝুলিয়ে ঝোল করে ছেড়েছে, সেটা মা – মেয়ের মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল। নইলে কথায় কথায় আমাদেরই পাত থেকে আলুভাজা সরানোর কোন প্রয়োজন ছিল কি?
বেলা চারটের সময় অমন গুরুপাক খাওয়া। আর তার ওপরে গোড়ালিতে খয়েরি রঙের ফোস্কা, গিন্নির হাঁটু চিনচিন আর কন্যাদের ঘনঘন ঢেঁকুরে বোঝাই যাচ্ছিল আর টানা যাবেনা বেশিক্ষণ! কিন্তু আজকেই তো আবার টাওয়ার অফ লন্ডনের টিকিট কাটা, আর তারপরেই ওই টেমসের উপরে নৌবিহারের কথাও তো লেখা রয়েছে প্ল্যানে। এইজায়গা থেকে টাওয়ার অফ লন্ডন পৌঁছতে আবার একটা অরেঞ্জ লাইনের নীল বাস ধরতে হবে। এতক্ষণে একটাও সেইরকমের নীল বাস তো চোখেও পড়েনি কারোরই। এইসব ভাবতে ভাবতেই পায়চারি করার ভঙ্গিতেই হাঁটছি তখন আমরা। আর খাবার পরে একটা করে আইসক্রিম খাওয়ার কথাটা বাজারে ছাড়ব কিনা, সেই বিবেচনা করতে করতেই সামনে দেখি একটা বিশাল ব্রোঞ্জের স্ট্যাচু।
না। এ আমাদের সকালে দেখা ওয়েস্ট মিন্সটারের মতন রাজারাজরা কেউ নন। মুর্তিটার বেশ ধারাল মুখচোখ, মাথায়ে একটা মস্ত টুপি আর ঠোঁটে একটা বাঁকানো স্মোকিং পাইপ। আমাদের বাঙালীর গুরু ফেলুদা, তাঁর গুরু শার্লক। শার্লক হোমস। মোবাইল ফোনে একটা ছবি তুলে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে নিলাম, আজ আমার লন্ডন আসা সাৰ্থক হল। তবে ডায়লগটার পুরোটা আর বলিনি। ওটা নাহয় রজনী সেন রোডের জন্যই তোলা থাক।
চলবে…
Leave a comment