শুভ বিজয়া রে ভাই! আরে থাক থাক। আর পায়ে হাত দিতে হবেনা রে ভাই। কত যেন দাদা মানিস আমায়? তোদের থেকে কত শালা সিগারেট বিড়ি ঝেঁপে খেলাম! আয় ভাই, তুই শুধু বুকে আয়। আজকের দিনে শুধু একটা কোলাকুলিই যথেষ্ট।
তা ভাই! তোরা কি এই বিজয়ার প্রণাম করার জন্যই কাল রাত্তিরে ভাসানের পর খুঁজছিলিস আমাকে? তাই ভাবি শালা, এমনি ঘনঘন বিষম ঠেকছে কেন? ঘরে চলে গেছিলাম রে! আর বলিসনা ভাই, কাল ভাসানের পর না, যাতা রকম টায়ার্ড ছিলাম’রে। আর শালা ওরকম পাগলার মতন নেচে, গোড়ালীতে কি উদুম পেইন রে ভাই। প্লাস তুই বল ভাই, সবকটা দিক একসাথে একাহাতে ম্যানেজ করা। তারপরে লাস্টে তোর ওই বাবুঘাটে পৌঁছে, ওইরম ভয়ঙ্কর টাইপের ভিড়। তারপর, আসল গল্প তোদের তো কাউকে বলিনি রে ভাই। গায়ে তো এদিকে শালা কন্টিন্যু একশোর ওপর জ্বর। এই পূজোর ছ’দিনে ভাই কতগুলো ক্রোসিন খেয়েছি জানিস? সে তোর কিছু না হলেও, বিশ পঁচিশটার বেশী হবে! সপ্তমীর মাঝরাত্তির দিয়ে, রাজাদার সাথে বাওয়ালের পরে, তোকে কি বলব ভাই, জ্বরে আমার পুরো গা মাথা পুড়ে যাচ্ছে। আর সাথে এমনি ডেঞ্জার মাথাব্যাথা করছিল না। আমি তো ভাবলাম, এই রে। পূজোটা গেলো বোধহয় শালা। তারপরে তোদের বুলনদির এক ধমকে, ক্লাবের ভিতরের ঘরটায় গিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে গেলাম। বুলনের আবার ওর কলেজের কয়েকজনের সাথে হোলনাইট ঠাকুরফাকুর দেখতে যাওয়ার ছিল। সে আমি কত করে বলছি, তুই যা বুলন। আমি ঠিক সামলে নিচ্ছি। তা সে তো যাবেইনা। সে আমার জ্বর ছাড়ল গিয়ে সকাল সাড়ে চারটে পাঁচটায়ে। তারপর তিনি বাড়ী গেলেন।
তা যাই হোক। সে তোরা যে যাই বল কাকা। পুজো কিন্তু এবারের ফুল হিট। শালা নতুন ধুতিফতুয়া পড়া চার-চারটে ঢাকী। তিনদিন ফাংশান পাড়ার সকলের দিয়ে। টানা পাঁচদিন ধরে দুবেলা ভোগখাওয়া। আর তোর নবমীতে পোলাও, মটর-পনির, পায়েস। সেদিন দুপুরে কত লোক ভোগ খেয়েছে জানিস ভাই? আশিস দা বলে ষোলশো। তুই বল ভাই? এ’জিনিষ হিস্ট্রিতে লাস্ট কবে হয়েছে রে? আর অষ্টমীতে বাবা-শঙ্করজ্যাঠাদের নাটক’টা? সেটা তো সুপারডুপার হিট। কেউ জানত রে ভাই, বাসন্তীকাকিমা অমনি ভাল অ্যাকটিং করতে পারে?
প্রথমদিন যখন ক্লাবের মীটিঙে কুট্টিদা আর আমি বললাম বাবাদের। সবে জুলাই মাস রে তখন, ভাই। তখনই সিনিয়রদের শালা সে’কি বেজায় ফুর্তি রে ভাই। নাটক বাছা, কোন পার্টটা কে করবে? গানের নাটক হবে, নাকি মজার, নাকি তোর গম্ভীর টাইপের কিছু। সে নিয়ে কত চা-শিঙাড়া যে এসেছে ক্লাবের ফান্ডের থেকে। তোকে কি বলব ভাই? আর তারপরে সেদিন, যেদিন ফাস্ট শিউলিফুল এলো ওই চালাঘরের পেছনের গাছটাতে? যূথীদি আর বাসন্তী কাকিমা সবকটা মাটিতে ঝড়ে যাওয়া ফুল কুড়িয়ে আমার হাতে দিয়ে বলে কি, ভাইয়া, যা। এগুলো একটু একটু করে সকলের ঘরেঘরে দিয়ে আয় দেখি। সিজনের প্রথম শিউলি। ভাই, দেখি বাসন্তীকাকিমার চোখে জল। ভবেনের সাথে কেসটা হেরে যাওয়ার পর সান্যালকাকাটা অমনি হয়ে গেলো! আর তার দেড় মাসের মধ্যেই তো স্ট্রোক। তবু কাকিমাটাকে বের তো করেছি বাড়ীর থেকে!
সে তুলনায়, অষ্টমীতে বুলনদের গ্রুপটা কিন্তু ফুল ঝোলাল রে ভাই। কি’সব গিটারফিটার নিয়ে ঝ্যাম্পর ঝ্যাম্পর যে করল। ভাই, ওটা নাকি বলে ব্যান্ডের গান! কে জানে রে ভাই? ওদের দলের ওই সাত্যকি বলে যে মালটা, আরে যে মালটা তোর ছেলের গলায় গানটা গায়! শালার কি দরকার ছিল ইংলিশ গানটা ধরার? শালা বাঙালীর পুজো প্যান্ডেলে, তোমার ওই লন্ডন আমেরিকা চলবে? তুই বল ভাই। তবে লাস্টের দিকে বুলন, মিতুল আর পিকুর বোনটা যখন লাল পাহাড়ি ফাহাড়ি করছে, তখন কিন্তু জমে গেছিল রে ভাই। আরে ভাই, ওই লাল পাহাড়ি নিয়েই তো আসল কেস হল তারপর। পাড়ার সব দিদি বৌদিরা নাচছে। আর তার মাঝের থেকে রাজাদাদের ওইরম ফাঁকায়ে বেশরম নাগীন ড্যান্স দেখে আমার দিমাগ তো ফুল গরম খেয়ে গেছিল! ওই নিয়েই তো লাগল শালা তারপর। বাপিন এসে বলে, ভাইয়া, রাজাদা’টা কিন্তু ফুল লোড। জয়াদির হাতফাত ধরে নাকি একবার টেনেওছে। তারপরেও, আমি গিয়ে বলাতে শালারা ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
তারপরে ভাই, বললে তুই বিশ্বাস করবিনা। রাত সাড়ে বারোটায়ে ঢাকীগুলোকে খিস্তি করে তুলছে। বলে বাজা। আমরা এখন ঢাকের সাথে ধুনুচি কম্পিটিশন করব। আমি প্রথমদিকটা কিছুই বলিনি রে ভাই। শুধু মাপছিলাম। পুজোগণ্ডার দিন বলে কথা। যা করবে করো। বুলনকে কথাও দিয়েছিলাম কোনরকমের বেকার ঝেল করবোনা বচ্ছরকার দিনে! তবে তারপরে যেমনি ঝুমুরবৌদিটার নাম নিয়ে টোন করা শুরু করেছে না! তখনই আমি ফুল সর্ট হয়ে গেছি। ওই শালা একশোদুই জ্বর গায়ে। রাজাদার সাথে যে ওই জয়দেবটা ছিল। দিয়েছি শালাকে একটা কানের গোঁড়ায়। আর তাইনা দেখে, তোদের ওই ঢ্যামনা শেতল’টা দেখি একটা জংধরা ওয়ানশটার বের করেছে পাঞ্জাবীর পকেট দিয়ে। মাল খেয়ে এদিকে শালার হাত স্টেডি নেই। কাঁপছে। আর ছাগলটা হাতে চেম্বার নিয়ে কাওতালি করছে। তারপরে নারায়ণদার হাতে তিন থাবড়া খেয়ে, শেষমেষ চুপ হল হারামজাদাগুলো।
তারপর তোকে আর কি বলব ভাই? গতকালও লেগেছিল রে। দুপুরে যখন বরণ হচ্ছে। কিছুর মধ্যে কিছু না। শালা কোত্থেকে রাজাদাটা এসে ঝুমুরবৌদিকে বলে, এখনই তোমরা সব ঠাকুরফাকুর বরণ করে নিচ্ছো? আজ তো ভাসান দিচ্ছিনা আমরা। আমি শালা কাছেই ছিলাম। মিতুলদের সাথে কি জানি একটা নিয়ে হাসি-মজাক করছিলাম। আমি তেমনি পাত্তা দেইনি। আমাকে এসে বলে, এই’যো সেক্রেটারি! আজ তোমার ভাসান হচ্ছেনা। জুম্মাবারে আমাদের ভাসান হয়না। রোববারে করব। শালা খিল্লি হচ্ছে যেন। তারপরে দেখি ভাই, দেখি শালা কুট্টিদা, বাপিন বাবুসোনা সবাই একমত। আমাকে বলে, ভাইয়া। রাজাদা কিন্তু ভুল তেমনি কিছু বলেনি। তুই একটু ভেবে দেখ। সেমনি হলে রোববারেই করনা বিসর্জনটা।
আসলে কিচ্ছু না’রে ভাই। রাজাদা বা বাবুসোনার ব্যাপার নয় রে এটা। মানুষের জীবনে দিনের দিন আনন্দ ব্যাপারটা এতো কমে যাচ্ছে না। ওই পুজো আসছে, পুজো আসছে ব্যাপারটাই না সবচাইতে ভাল। হাসির নাটক নাকি সিরিয়াস, মহাবলীপূরমের টেম্পল হবে নাকি বেলুড় মঠ, ডাকের সাজ নাকি সোনালি, নবমীতে খিচুড়ি নাকি এবারে পোলাউ খাওয়ানো হবে। এতেই কিন্তু বাঙালীর মজা। এতেই আনন্দ। কিন্তু তুই ভেবে বল ভাই। এমনি ভাবে, আনন্দ’কে টেনেহিঁচড়ে কি নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায়?
জানিস ভাই। কেউ আনন্দ পায় ভরপেট খেয়ে, কেউ পায় প্রেমে। কেউ আবার নেশাভাঙ করে। কেউ আবার শালা দিনে ছ’ঘন্টা করে ব্যায়াম করেই খুঁজে নেয় আনন্দ। সুখ, আনন্দ, উল্লাস, সব জানিস ভাই, কেমন জানি একটা অস্পষ্ট ব্যাপার। আমি তখন বললাম বাপিনকে। বললাম বাপিন – ক্লাবের কায়দাকানুন আমার হাতে থাকলেই সে কানুন থেকে কি আমরা সরে যাব? শুধুমাত্র দুদিন আনন্দটাকে বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য? যেই না বলেছি ভাই, ওই মিনিটপাঁচেক একটু সব মুখ গোমড়া করে ছিল সব। তারপরে তো তোদের রাজাদাই ফাস্ট হাত লাগাল। হাঁক দিয়ে বলে, আয় তোরা সব! লাগা হাত লাগা। বলো বলো দুর্গা মাঈ কি! আসচে বছর আবার হবে!
ভাই, ভিড় থাকলে কি হবে? বিসর্জনটা না ভাই, খুব মন দিয়ে দেখলাম রে এবার। আর এমনি ভিড়ের মধ্যে, বুলন’টা আমার হাতটা চেপে ধরে আছে। আমাদের ঠাকুরটা ভাই নিয়ে গেলো। নিয়ে গেলো অনেকটা গভীরে। চিত করে মা’কে ডুবিয়ে দেওয়ার পর প্রায় মিনিট খানেক বাদে ছেলেটাকে দেখলাম আবার সাঁতরে আসছে পাড়ের দিকে। পাড়ে এসে আমার হাতে ধরিয়ে দিলো একটুখানি মাটি। আর মিতুলটা তখন কাঁদছে। আমি বললাম, ওই দ্যাখ মিতুল। কত্তগুলো বাঁশের কাঠামো, পড়ে আছে এই চড়ায়। একাদশী দ্বাদশীতে ভাঁটার সময়ে কেউ এসে ঠিক তুলে নিয়ে যাবে ওইগুলো। এই তোর মেজদার হাতের একচিলতে পলিমাটি, আর ওই একটা মজবুত কাঠামো। এই দিয়েই না আবার আমরা আগামী বছরের জন্য রেডি হব। নতুন করে তৈরি করাতেই তো আনন্দ। যেমন তোর হাতে হল না আমাদের পেছনের ওই পেয়ারাগাছটা? ক্লাবে ফিরে দেখি ঠাকুরমশাইটা শান্তির জল নিয়ে রেডি। আর ওদিকে বাবারা শঙ্করজ্যাঠারা সব কোলাকুলি শুরু করে দিয়েছে।
আর তখনই আমার হেবি ক্লান্ত লাগতে শুরু করেছে রে ভাই। শুধু বাড়ি যাওয়ার আগে, বুলনের হাতটা ধরে একবার দেখতে গেলাম চালাঘরের পেছনের শিউলি গাছটা। কত ফুল মাটিতে ছেয়ে আছে রে ভাই তখনও। রাজাদাকে ডেকে দেখালাম গাছটা আর ফুলগুলো। শিউলি তো ফুরোয়নি তখনও, আর আনন্দ ফুরোবে কেন? আর টুক করে একটা প্রণাম করে, কোলাকুলিটা সেরে নিলাম রাজাদার সাথে। রাজাদা বলে, ভাইয়া, তুইই ঠিক। রোববার পর্যন্ত ঠাকুর রেখে দেওয়ায় কোন মস্তি নেই। বহুত মস্তি হল আজকের তোর সাথে কোলাকুলিতে। শুভ বিজয়া রে ভাইয়া।
মুম্বই
অক্টোবর ২০, ২০১৮
Leave a comment