জানিস ভাই # ৯

না রে ভাই, আজ আর কোন বেকার ভাঁট করবনা রে তোর সাথে। আজ শালা আর ক্লাবের দিকেও যাবনা। মনটা না, আজ বিলকুল সাথ দিচ্ছে না’রে ভাই। শেষে কিনা বুলন? তুই আমায় বল ভাই, শেষে কিনা বুলন? আর ভাই, একলা ডেকে বলবি বল। সকলের সামনে কিনা, এমনি টাইপের বেইজ্জত? ভাবলে, এখনও আমার কানফান ঝাঁঝাঁ করছে রে ভাই। আরে একটা সামান্য সিমকার্ড রে। একটা শালা প্ল্যাস্টিকের আধাইঞ্চি কি কোয়ার্টার ইঞ্চির একটা কার্ড। শালা সোনা নয় দানা নয়, সেই নিয়ে কি বেকার বাওয়ালি। আরে, আমার ফোনটা না, এই মাস দুয়েক আগে, শালা ওই ফোন কোম্পানি থেকে ফাঁকায়ে কেটে দিয়ে চলে গেলো। কাটলো মিনস, হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে গেলো। আমি দেখছি শালা নো ইনকামিং, নো আউটগোয়িং। কি ঝামেলা বল তুই ভাই। আরে চ্যাটফ্যাট তখন সব বন্ধ। আরে না রে ভাই, শালা প্রিপেডে ছিল রে। পয়সা কড়ির কেস নয়। আর যেদিন বন্ধ করল, তার ঠিক আগের সন্ধ্যেবেলা একটা আটাশ টাকার পাওয়ার রিচার্জ করেছি বড়রাস্তার ওই নতুন পূজা টেলিকম  দোকান দিয়ে।

আমার তো সেদিনকা দিমাগ ফুল সর্ট হয়ে গেছিল। যেই ফোন বন্ধ করে দিয়েছে, ওই পূজা টেলিকমে গিয়ে কি ভয়ানক বাওয়াল দিলাম আমি আর পাগলা কার্ত্তিক। কার্ত্তিক তো শালা সে ওদের দোকানের কাঁচফাচে তখন দুমদাম কিলফিল মারছে। তো ওই পূজা দোকানের বাচ্চা মেড়োটা বলল, আরে ভাইয়া, আপ ইতনা পরেসানি মাত হইয়ে। আপনার সব ডকুমেন্ট ফকুমেন্ট হামকো আভি কা আভি দিজিয়ে, হাম বিন্দাস লাইন চালু কর দেগা আপকা, কোম্পানি সে বাত করকে। এদিকে কি তোকে বলব ভাই, আমার তো ডকুমেন্ট বলতে তেমনি কিছু নেই। ওই যা মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড আর একটা ভোটার কার্ড। আর এমনি ঝামেলা তোকে কি বলব ভাই, ওই দাদাদের বাড়ি শিফটিঙ সময় থেকে না, সে পুরো খামটাই কোথায় শালা হাপিশ হয়ে গেছে। তুই তো জানিস, সব তো আমাদের বৌদিই দেখত।

তারপরে আমি জানিসতো ভাই, টেনশন ফেন্সন খেয়ে বুলনকে শেষপর্যন্ত বললাম। আর কাকে বলব রে, পাড়ায়ে। ওকে ছাড়া? তারপরে ওই তোদের বুলনদির আধার কার্ডটার একটা জেরক্স নিয়ে, সোজা দিয়ে দিলাম পূজার দোকানে। আর সেদিন মাঝরাত্তিরে থেকে লাইন আমার ফের চালু করে দিলো। তারপরে গত দুমাসে তেমনি সেরম কিছু চক্কর হয়নি রে ভাই। আমার তো ফোনের তেমনি নেশা নেই, জানিসই তো তোরা। এরই মধ্যে থেকে, তোদের সবার পেয়ারের বুলনদি, সবার সামনে আমাকে কাল ক্লাবের উঠোনে বলে কিনা, ভাইয়া আর কতদিন আমার নামের সিম দিয়ে চালাবি রে তুই? এবার নিজের একটা করে নে। আর যেই বলেছে বুলন, আবার পাশের থেকে তেমনি ঝিমলিটা বলছে, হ্যাঁ রে বুলন। যদি ভাইয়ার ফোনে, তেমনি কিছু উল্টোপাল্টা কিছু মাল মেটিরিয়াল থাকে, তবে গভর্নমেন্টের খাতায়ে নাম তো খারাপ হবে তোরই। আমি তো ভাই, বললে বিশ্বাস করবিনা ভাই, ফাস্টের দিকে হাঁ করে শুনছি ওদের কথা। তেমনি মাথায়ে কিছু ঢোকেনি তখনও। হাল্কা করে ভাবলাম, সব বুঝি বুলনের নাম নিয়ে, আমার পেছনে কেস দিচ্ছে।

তারপর যেমনি না ধরতে পেরেছি আমি, যে শালারা আমাকে বেকার বেইজ্জতি করছে, আমার তো ভাই, তোকে কি বলব রে, অপমানে তখন চোখফোখ জ্বালা করছে। তোকে বলছি ভাই, রাজাদার বোন বলে বলছিনা, ঝিমলিটার সাথে না, আমার কোনোদিনই তেমনি ভাল রিলেসন ছিলনা। বাপিনের সাথে ওর কাটাকুটি হয়ে যাওয়াতে, আমি তো তারপর থেকে মালটাকে এড়িয়েই চলতাম। তারপরে ওই তোদের কোচিং ক্লাসে গিয়ে গিয়ে বুলনের সাথে ঝিমলির তো এখন খুব দহরমমহরম। সারাদিন শালা এ ওর ছবি সকাল বিকেল ফেসবুকে সাঁটছে। তারপরে বুঝলাম, ওই ন্যাকা ঝিমলিই শালা বুলনের মাথায়ে ঢুকিয়েছে ওই আঁধার কার্ড আর শালা সিম কার্ডের গল্প। শালা তুই বল আমাকে ভাই। আজ অবধি তোদের ভাইয়াদা ফেসবুক করল না, ভিডিও মিডিও তেমনি কিছু দেখল না, কেবল ওই তোদের আজকাল যে চ্যাট হয়, ওইটাই একটু রাতের দিকে করি। তাতেই শালা এত্ত ঝ্যামেলা। আমি তক্ষুনি তক্ষুনি দিয়ে দিলাম রে ভাই। ওই এক সেকেন্ডের মধ্যে আমি ফোনের থেকে সিমটা খুলে দিয়ে দিলাম তোদের বুলনদিকে। নাও ভাই। এই তোদের ভাইয়াদার জন্য যেন কারো আবার বদনাম না হয়ে যায়।

তবে কি জানিস ভাই? বুলন কিন্তু ভুল কিছু বলেনি। হ্যাঁ এটা তোরা বলতেই পারিস কি, ভাইয়াদা, পাড়ার মধ্যে তোমার আর বুলনদির যা রিলেশন, সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে, বুলনদি এমনিটা সবার সামনে না করলেই পারত। কিন্তু এইসবের ভেতরে তুই কিন্তু আসল বিষয়টা মিস করে যাসনা ভাই। তুই ঠাণ্ডা মাথায়ে ভেবে দেখ ভাই। শালা সরকার থেকে একটা কিনা কার্ড বের করল। তা কেন করল? শালা এতো এতো টাইপের কার্ড’তো বের করেছ তোমরা এদ্দিন ধরে। তোমরা রেশন কার্ড করেছ, প্যানকার্ড করেছ, ভোটার কার্ড করেছ, সিনিয়র সিটিজেন কার্ড করেছ। আরও কত হ্যান কার্ড, ত্যান কার্ড করেছ। তা আমার প্রশ্নটা হচ্ছে, তো এতো থাকতে, আরেকটা আঁধার কার্ডের কিসের দরকার ছিল’রে ভাই? আরে তখন তো তোরা সব এইটুকুন পুঁচকে রে ভাই। আমরা সব শুনলাম, ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট থেকে কিসব চোখের ভেতরকার ছবিফবি নিয়ে একটা নাকি বারো সংখ্যার কি একটা নতুন কার্ড দেবে। আর সেটাতে নাকি তোর ব্যাঙ্কের খাতা বল, ফোনের সিম বল আর গ্যাসে ইলেকট্রিকের লাইন বল। সব ওই একচান্সেই পাওয়া যাবে।

বাবারা প্রথমদিকটা তেমনি পাত্তা দেয়নি রে ভাই। আমার সে খুব ভালরকম করে মনে আছে রে। আমাদের ক্লাবের সামনেটা ফাস্টে একটা ক্যাম্প বসাল। প্রথম তিনদিন তো সে ক্যাম্প ফুল ফাঁকা পরেছিল রে। আমাদের পাড়ার কোন শালা আসেনি। তারপর শঙ্করজ্যাঠা পরদিন যখন সবাইকে ডেকে মীটিঙে বলল, এই কার্ডটা সবাই নিয়ে রাখো। জাতপাত ধর্ম কিমবা ভাষার তেমনি কোন বাছবিচার নেই, তখন না গিয়ে সবাই সেই লাইনফাইন দিয়ে চোখের ছবি নেওয়ালো। আমিও করিয়েছিলাম রে ভাই। তারপরে আর ওই রাজাদাদের সাথে ওই থানাপুলিশের কেসটা হয়ে যাওয়ার পর, কার্ডটা নেওয়ার জন্য আর তেমনি গা করিনি। তারপর এখন তোদের এই গভর্নমেন্ট আসার পর’তো দেখলাম, শালা আঁধারই নাকি সব। প্যানকার্ড, ইনকাম ট্যাক্স, ফোনের লাইন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স – শালা সব জায়গায় নাকি আঁধার দিতে হবে। সে তোমার যদি আঁধার না থাকে, তবে তুমি শালা সরকারী কোন সুযোগ সুবিধা কিছু পাবেনা।

লাও। তারপরে তো শালা গভর্নমেন্ট থেকে কি’সব জালি আইনফাইন করে ব্যাপারটা পাশ করিয়ে দিলো লোকসভার দিয়ে। তারপরে ভাই ওই পাঁচশো টাকা আর একশো টাকার কেসটার পর তো, আঁধারেরই রমরমা। সব তো তোর ফোনের দিয়ে হচ্ছে। শালা পকেটে তোমার একটা ফোন থাকলেই হবে। ফোনে পয়সা ভরো রে, ফোনে ট্যাক্সি ডাকো রে, সিনেমা টিকিট কাটো রে। এমনকি ভাই, বাংলা সিরিয়াল ফিরিয়াল নাকি সব এসে গেছে ফোনের মধ্যে। একদিক থেকে ভাল রে ভাই। আর কিছু হোক না হোক, এই শালার ফড়ে দালাল গুলো ভাল কেস খেয়েছে। কিন্তু অসুবিধা কি জানিসতো ভাই। এই শালা আঁধারের জামানায়ে, মানুষের জীবনে গোপনীয়তা বলে আর কিন্তু কিছু নেই। সে তুমি আলিপুর চিড়িয়াখানা গেলে, নাকি শালা সোনাগাছি, সেও তোমার পেছনে পেছনে তোমাকে ধাওয়া করছে তোমার ফোন। মানে তোমার সিমকার্ড। মানে তোমার আঁধার। মানে শালা সরকার। তুমি কোন রাত্তিরে কোন হোটেলে বসে, কোন বান্ধবীর সাথে, কোন বিরিয়ানি কাটলেট মারলে। কোন ট্যাক্সি চেপে, কটার সময়ে, কোন সিনেমা হলে, কত টাকার টিকিটে, কার পাশে বসে, কটা কনুই করলে। সব শালা ধরা পরবে তোমার ফোনের ভেতর। আর তোমার সব খবর, সব হিসাব, সব ঠিকুজি কুলুজী, সব জানবে গভর্নমেন্ট। আর এই ফোন কোম্পানিদের দিয়ে, চড়া দামে বিক্রি হবে বিশ্ববাজারে। মোটকথা তুমি শালা একটা পণ্য। আঁধারের হাতের তালুর ফাঁকে আটকে যাওয়া একটা পণ্য। হ্যাঁ। মানছি রে ভাই। দেশের সব নাগরিকের জন্য একটা কিছু ভাল পরিচয়পত্র তৈরি তো হওয়াই উচিত। বিশেষ করে গ্রামের মানুষদের। গরীব মানুষদের। দাও না। শালা সাধারণ মানুষের ব্যাংক খাতায় যাতে ভর্তুকির টাকা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে, তার জন্য রাখো আঁধার। হাঁটাও শালা দাল্লাগুলোকে। কিন্তু শালা নতুন করে পাওয়ারে এসে অন্যভাবে অন্যরকম ব্যবসা করোনা তোমরা। বেসরকারি ফোন কোম্পানি, গ্যাস কোম্পানি, ব্যাঙ্ক, ট্যাক্সি, সিনেমা হল, শালা বাড়িয়ে বাড়িয়ে কোথায় যাবে শেষমেশ? কতরকম ভাবে ফাঁস হবে আমাদের গোপন নাগরিক তথ্য। এমনি একটা ভাল জিনিষ শেষ পর্যন্ত কিনা বিভিন্ন সংগঠন থেকে সুপ্রিম কোর্টে পাঠাতে হল?

কি আর তোকে বলব রে ভাই? তোদের বুলনদিকে দোষ আর দেব কেন? ও তো ন্যায্য কারণেই ভয় পেয়েছে। আর ওই নেকু ঝিমলিটা সেই ভয় নিয়ে খেজুর করেছে। না রে ভাই, তোর সাথে কথা বলে না অনেকটা ফ্রেশ লাগছে। অনেকটা ফ্রী লাগছে। বুঝতে পারছি বুলনের কোন তেমনি দোষ নেই। সব আমরা ওই যেমনি ছিলাম, তেমনিই আছি। চন্দ্রগুপ্ত বল, অশোক বল, আর আকবর অউরংজেব বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বল। আমরা শালা শুধু রাজার হাতের প্রজা। সবাই না ভাই, সব রাজারা না, শুধুমাত্র ওই ফুটো খুঁজছে। ফুটো পেলেই দেবে শালা ভরে। কোনটা ন্যায়, কোনটা শালা অন্যায়, কোনটা মাংস, কোনটা হাড়, সব শালা ওই রাজারাই বলে দেবে।

দে ভাই। একটা সিগারেট খাওয়া। বকবক করে গলাটা খুব টায়ার্ড লাগছে। আর ভাল কথা, তোদের বুলনদির সাথে দেখা হলে, বলিস তো, ভাইয়াদাটার খুব মন খারাপ। আর বলিস ভাইয়া ওকে সরি বলেছে।

মুম্বই

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮

Leave a comment