জানিস ভাই Ÿ ৮

কি হল রে ভাই তোদের? এতো শালা বিজি কোনোদিন তো তোদের গ্রুপটাকে দেখিনি! কিসের রাত জেগে অফিস আর ওই সেক্টর ফাইভ দেখাচ্ছিস তোদের ভাইয়াদা’কে? একদিনের জন্যও আসতে পারলিনা ক্লাবের প্যান্ডেলে? শালা পাড়ার ফাস্টটাইমের গণপতি। তোরা সকলে সবাই মিলে সব একজুট না হলে হয়? বল। বাবুসোনা নেই, বাপিন নেই, অনিমেষ নেই, তোরা শালা কেউ কোথাও নেই। সব আমাকে তোরা অফসাইট অনসাইট আর প্রাইভেট কোম্পানি দেখাচ্ছিস? ভেবে দেখ ভাই, একার হাতে এই শালা দশবারো দিনের পুজোর কাজ। আরে আমিও তো রাতে ঘুমোই, না কি রে? সেই শালা লজ্জার মাথা খেয়ে, যেতে হল শেষে আমাকে ওই রাজাদাদের কাছে। শালা কোথায় ভাবলাম, ক্লাবের ফাস্টটাইমের গণপতি। পাড়ার পুরোনো ছেলেরা সব মিলেজুলে করবে। একটু কালচারাল প্রোগ্রাম-ফোগ্রাম হবে। একটু স্টলফল দেওয়া হবে। পাড়ার ছোট বাচ্চাফাচ্চা গুলো বেলুন বাঁশি নিয়ে খেলে বেড়াবে। আমাদের মেয়েরা, বৌদিরা একটু সেজেগুঁজে ক্লাবের মাঠে আসবে। মায়েরা জেঠিমারা একটু হাঁফ ছেড়ে, দিদি নাম্বার ওয়ান আর কুসুমদোলা না করে, একটু সকলের সাথে সকলের দেখা হবে। হুল্লোড় হবে। কিন্তু শালা কোথায় কি? ভাইয়া শালা ভাবে একরকম আর হয় শালা অন্য কিছু।

ক্লাবটাতে তো কিছুই আর হয়নারে ভাই আজকাল। রবীন্দ্রজয়ন্তী বন্ধ, বর্ষামঙ্গল সেই লাস্ট বোধহয় দুহাজার দুই নাকি দুহাজার তিনে একবার হয়েছিল। বিশ্বকর্মা পূজোটা চলে গেল সাটেল অটো স্ট্যান্ডের কব্জায়। ওই তিমির আর লাল্টুরাই তো আজকাল স্ট্যান্ডের হিরো। সব কিছু তো ওরাই দেখছে। সেই কারণে ভাবলাম পাড়ায়ে একটা কিছু কাজের কাজ করি। একটা ভাল কিছু নামাই। গেল মাসে আগারওয়ালের কাছে যখন মান্থলি কালেকশানে গেছি, ওই মেড়োই বলল শালা। প্লাস বলে, মাসে মাসে এই দেড় দুহাজার করে দেওয়া হয় আপলোগোকো, কুছ তো কাম, কুছ কুছ পূজা আরাধনা তো কিজিয়ে। আমিও তেমনি সেয়ানা রে ভাই! আমিও সটান মুখের ওপর বলে দিলাম, এক্সট্রা পয়সা নিকালো, ব্যাটা সবকুছ বরাবর হো যায়গা। পূজা করেগা, পারামে মেলা করেগা, জুলুস করেগা। তা দিলো শালা এক্সট্রা খরচা কিছু। দশ বললাম, সাড়ে আট দিল। আর শালা সেই কারণেই রিস্কটা নিয়ে নিলাম রে ভাই। তারপরে তোরা যদি সকলে বেকসুর ডুব মেরে দিস, কেমনিটা লাগে বল?

পরশু সন্ধ্যেবেলা তো, শালা কেউ কোথাও নেই। দুটো মাত্র শালা রাস্তার লাইট জ্বলছে টিমটিম করে। শালা ডায়েবাঁয়ে মশা ভনভন করছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি আর এই তোদের গাধার বাচ্চা ভাইয়াদা, শালা বেকার। শালা একাএকা বোকার মতন কর্পূরফরপুর জ্বেলে ধুপদীপ দিয়ে আরতি করছে। কি না মেড়োদের থেকে পয়সা নিয়েছে! শালা এদিকে তো মন্ত্রফন্ত্র কিস্যু জানিনা রে ভাই। ঠাকুরমশাইয়ের শুনলাম হাঁপানির টান উঠেছে। মোবাইলে একটা গণেশবন্দনা না কি, মেসেজ পাঠাল তোদের বুলনদি। ওইটাকেই শালা ফোনের মধ্যে দিয়ে চালিয়ে পাক্কা পঁচিশ মিনিট একাএকা আরতি। শঙ্করজ্যাঠা বাবারা তো শত সাধলেও আসবেনা। তারপর বুঝলাম মা কাকিমাদেরও কাউকে আসতে দেবেনা। সব শালা আমাদের সংগ্রামী অতীতের নিদর্শন। বুঝলিনা ভাই। শালা যত সব ঢপের সংগ্রাম। ঠাকুর পূজো করবনা, করতে দেবনা।

আর তারপর কি বলব ভাই তোকে! এই স্বাধীনতা দিবসের রাত্তিরবেলা এই গণেশ পুজো নিয়ে, ক্লাবে তোর সে কি বাওয়াল। শালা, মিটিঙে শঙ্করজ্যাঠাটা বলে কি, ক্লাবে এত বেকার তোরা পুজোআচ্চা বাড়াস’না। ওসব গণেশ-ফনেশ শুনেছি মারাঠীদের হয়। ও আমাদের বাঙালীদের ঘরে ওসব হয়না। তারপর বলে কি ভাই, তোরা যত বেশী এই এসব পাড়ার মধ্যে ঠাকুরদেবতা নিয়ে পড়বি, তত করে ওই রাজাদের ফ্যসিস্ত গ্রুপটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। আমার না ভাই, কি বলব তোকে ভাই, শঙ্করজ্যাঠার কথাটা শুনে না, দিমাক ফুল গরম খেয়ে গেছিল। শালা, পূজো করছি আমরা, মেইন পয়সা দিচ্ছে আগারওয়াল। শালা তোমার কি বে। তুমি বেকার কাঠি করছ কেন? শালা, চৌত্রিশটা বছর ধরে আমাদের গোটা দু জেনেরেশনকে শুধু বাতেলা মেরে গেলে?

তবে কি জানিস ভাই, তেমনি করে কিছু বলতে পারিনি সেদিন। ওই লোকটার না, পাড়ায় এখনও অনেক রেসপেক্ট আছে। আফটার অল, মালটা পলিটিক্সে থাকলেও, কিন্তু ভবেনের মতন পয়সাফয়সা খায়নি কোনদিন। তবে সেদিন না, বলেই দিতাম রে ভাই। শঙ্করজ্যাঠাকে। ঠিক টাইমে না ভাই, সামলে গেছি। শুধু বাপিনের মুখটা না, কেমনি যেন ভেসে এল চোখের ওপর। শালা যদি মালটা বাপিনের বাপ না হত না, আমি তো ভাই মুখের ওপর স্ট্রেট শুনিয়েই দিতাম। শালা, বুর্জোয়া, প্রতিক্রিয়াশীল, কেন্দ্রের বঞ্চনা, সাম্যবাদী মতাদর্শ, এইসব ঢপের বুকনি না, অনেক হয়েছে। অনেক বরদাস্ করে নিয়েছি। অনেক হুলতাল দিয়েছ শালা, ফুল চৌত্রিশটা বছর ধরে।

তবে কেবল সিনিয়রদের বলব কেন ভাই? আমাদের নিজেদের মধ্যেই এমনি সব কেলো জিনিষ। শালা কুট্টি, খোকন বলেছিল আমরা আছি ফুল টাইম তোর সাথে ভাইয়া। তুই বেড়ে খ্যাল। শালা। বলেকয়ে এখন বলে, ভাইয়া, একটা ইনটাররভিউ এসেছে রে পুনেতে। আমাকে বাদ দে। গেছিল কুট্টি খোকন আমার সাথে ঠাকুরমশাইয়ের কাছে। খোকন বলে, জেনে রাখা ভাল, মালটা কোনদিন গণেশ পূজোফুজো করেছে কিনা। কি বলব ভাই তোকে, ঠাকুরমশাইটাকে দেখে এমনি খারাপ লাগল না! ফুল বুড়ো হয়ে গেছে রে ভাই। ঘরে একটা জিরো পাওয়ারের বাল্ব জ্বেলে রেখেছে। পাখা বন্ধ। একটা ছোটমতন টিভিতে কীসব আলফাল দেখছে। পাড়ায়ে গণপতির কথা শুনে সে কি তার এলাহি উত্তেজনা রে ভাই? সে আমাদের সামনেই পাঁজিফাজি ঘেঁটে তিথিফিথি সব বলে দিলো। খোকনকে তারপরে জড়িয়ে ধরে কি আশীর্বাদ! শালা খোকনটা বেরিয়ে বলে, ঢ্যামনার চোখ দেখলি ভাইয়া? ফুল চকচক করছে। শালা মেড়োর চাঁদায়ে গণপতি হবে শুনে, ভাবছে বহুত লগগা হবে!

আমি না ভাই, সেদিনই ভাই, ঠিক করেছি গণপতি তো শালা নামাবই। হারগিস হারটাইম নামাবো। ও শালা আমার বাপ বলুক আর কমরেড শঙ্কর বলুক। কেউ থাক না থাক আমার সাইডে, কোন শালা সাথ না দিক, ভাইয়া তো শালা গণপতি নামাবেই। তুই নিজে বল ভাই? এতো কিছু তো সব বুঝিস, এতো’তো লেখাপড়া ইঞ্জিনিয়ারিং ফিঞ্জিনিয়ারিং মাড়ালি। তুই নিজের বুকে হাত দিয়ে বল ভাই। আমরা যদি ক্লাবে এমনি রকম সব পূজোফুজো না নামাই, না করি, কোথায় যাবে এই আমাদের এই গরীব ঠাকুরমশাইরা? যদি দুটো স্টল না বসাই রোল চাওমিনের, বিরিয়ানী ফুচকা আলুরদমের, কোথায় যাবে আমাদের পাড়ার এই গরীব অসহায় দোকানদারগুলো? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে নির্মলদার ওই দশকর্ম ভাণ্ডার? তুই বল ভাই। যদি এই গণপতির প্যান্ডেল না হবে, কোথায় যাবে আমাদের এই মাতৃ ডেকরেটার? কি খাবে ওই রাস্তার মোড়ের ফুলওলাটা?

হ্যাঁ রে ভাই। বুক বাজিয়ে বলছি রে ভাই। আমি তোদের মতন না, অত ফাইনান্স ইকনমি টিকনমি বুঝিনা রে ভাই। ওসব ন্যাকামির পলিটিক্স, রোজ রাত নটায়, ইংলিস খবর চ্যানেলের নেতাদের চিলচিৎকার, ও আমার ধাতে পোষায়না। এই শালা কোনটা কেন্দ্রীয় সরকারের যোজনা কমিশন আর কোনটা কোথাকার আধা সরকারী কর্মচারীদের বেসিক, কোনটা ডিএ, কোনটা শালা পিএফ। ও আমার এলাকার বাইরে। শালা টিডিএস হবে নাকি রাজ্য সরকারের জিএসটি বসবে, এসব আমার নিরেট মাথায়ে ঢোকেনি কোনোদিন। শালা ঢুকবেও না এ জীবনে। আমি এটুকুই বুঝি, এতো টুকুন জানি – মানুষকে হরজামানায় শালা ভাল করে রাখতে হবে। ভাল করে পেট পুরে খেতে দিতে হবে। স্বাস্থ্যের খেয়াল করতে হবে। বাচ্চাদের লেখাপড়া, খেলাধুলা করতে দিতে হবে। আর শুধু কয়েকটা মানুষ নয়। সব্বাই কে। সক্কল কে। তার মধ্যে যেমন তুই আছিস ভাই, যেমনি তোদের বুলনদি, তেমনি ওই ঠাকুরমশাইকেও বাদ দিলে চলবেনা রে ভাই। বাদ দেওয়া যাবেনা ওই আমাদের মাতৃ ডেকরেটারের ছেলেটাকে। আমাদের এই পাড়ার মধ্যে কাউকে আমি না, না খেয়ে শুতে যেতে দিতে পারবোনা রে ভাই। তার জন্য গণপতি কেন রে ভাই, প্রতি শনিবারে আমি প্যান্ডেল করে শনিপূজো নামাতেও হয়, তাতেও এই পাগলা ভাইয়া রাজি। যদি আশিসের কেটারিং বিজনেসে দুটো খদ্দের আসে, আমি রাজি আছি রে ঈদের ইফতার পার্টিতে। যদি কমলের দোকান থেকে দুটো বেশী কেক বিস্কুট বিক্রী হয়, আমি রাজী আছি রে যীশুর জন্মদিনে।

আর কেউ না বুঝুক, তুই তো বুঝবি ভাই, আমাদের পাড়ার এই পেটটাই ভরবে শালা পাড়ার মধ্যে কিছু একটা মোচ্ছব করে। বছরে মিনিমাম চারটে থেকে পাঁচটা টাইপ পুজো, দুটো ঈদ, একটা যীশুর জন্মদিন না করলে ভাই, আমাদের এই পাড়াটা চলবে কি করে বল? কতদিন আর চাঁদার টাকায়ে টানবে তোদের ভাইয়াদা আশিসকে আর কমলকে? বললে বিশ্বাস করবিনা ভাই, এখন তো শুনছি, আশিসদাটা রোজ রাত্তিরে মাল খেয়ে লোড হয়ে এসে ঝুমুরবৌদিটাকে বেকার ক্যালায়। তুই বল ভাই, আজ আমরা ক্লাবের ছেলেরা যদি পাড়ার মধ্যে ব্যবসাপাতি না বাড়াতে পারি, এই আশিসদা কমলদা শক্তিদার মতন আর পাঁচজনকে যদি মেইন লাইনে না নিয়ে আসতে পারি, তবে কি করল তোদের সেক্রেটারি ভাইয়াদা?

হ্যাঁ মানছি রে ভাই। হ্যাঁ মানছি আছে অনেক আনকা ঝামেলা। অনেক বাওয়াল হবে। অনেক খিস্তাখিস্তি। ঈদ, গণপতি আর যীশু একসঙ্গে শুনে অনেক রক্ত পড়বে পাড়ায়। অনেক বেইজ্জত করবে আমাকে রাজাদারা। অনেক টোন করবে শঙ্করজ্যাঠারা। পারমিশানের নামে অনেক পয়সা লুটবে শালা ভবেন। কিন্তু ভুলিসনা ভাই, যদি আশিসদার কেটারিংটা চালু হয়, যদি ওদের সংসারটা ভালমতন করে চলে যায়, ঝুমুরবৌদি যদি আবার নতুন করে সেলাইয়ের দোকানটা শুরু করতে পারে, নির্মলদার দোকানটা যদি আরেকবারের জন্য নিজের মতন দাঁড়িয়ে যায়, সেদিনটা একটুখানি ভাব ভাই। সেদিনটা ভাব। গমগম করবে আবার আমাদের পাড়াটা। ক্লাবের মাঠে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট করব। একটা ডাক্তার বসাব নন্দর ওখানে। শীতের রাত্তিরে আবার করে সব ব্যাডমিন্টন খেলব। নরেন্দ্রপুরে সব মিলে আবার পিকনিক। নতুন একটা পৌরানিক নাটক নামাব সপ্তমীতে। বুলনদের দিয়ে অষ্টমীতে একটা গানের ফাংসান করব। আর তুই গাইবি ভাই বুলনের সাথে একটা ডুয়েট। নবমীতে রাত্তিরে ম্যারাপ বেঁধে মাংস ভাত। পাড়ার সব বাচ্চা, মেয়ে বৌ, বুড়ো বুড়ী মিলে লাক্সারি বাসে করে ভাসান করব। আর ভাই, একাদশীতে একটা বিজয়া সম্মালনী। ক্লাবের মাঠে। আর ভাই কিছু না হোক, রাজাদাকে দেখিয়ে দেব মেড়োর টাকায় ঈদ – গণপতি করে, এই তোদের ভাইয়াদা আর কিছু না হোক, পাড়ায় হাসি ফেরাতে পেরেছে। একটু সাথ দিস ভাই। একটু পাশে থাকিস রে।

কাল চতুর্দশীতে গণপতি বিসর্জন করছি। কথা দে ভাই, সাড়ে সাতটার মধ্যেই পৌঁছে যাবি। আর শোন ভাই, ভাল কথা, দে একটা সিগারেট দে, নাকি ন্যাকামো করে ওটাও ছেড়ে দিয়েছিস?

মুম্বই
সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮

Leave a comment