আর বলিস না রে ভাই। আর তো পোষাচ্ছেনা দেখছি। এবার তো শালা দেখছি আমাকে নিজেকে নিজেকেই হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে হবে’রে। আগের দিনে জানিস তো ভাই, এই তোর দু চার বছর আগের কথাই বলছি। পাড়ায়ে কারোর কোন বাড়াবাড়ি কিছু হয়ে গেলে, বোতল বোতল ব্লাড দিয়ে দিয়েছি একটা টাইমে, লোক জোগাড় করেছি, ঘরেঘরে ঘুরে চাঁদা তুলেছি, টানা পাঁচছয় দিন কনটিনিউ রাত জেগে দিয়েছি, সে মাঝরাত্তিরে পিজি’র পাশের ওষুধের দোকানগুলো থেকে ইঞ্জেক্সান-ফিঞ্জেক্সান এনে দিয়েছি, যখন যেমনিটা দরকার। কিন্তু এখন এই বাজারে সে সবের কিছুটির দাম নেই রে ভাই। এখন শালা কেস ভেরি সিম্পিল। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। পয়সা ফেকো, তামাসা দেখো।
আমি তো ভাই কাল রাত্তিরে লজ্জার মাথা খেয়ে গলা উঁচিয়ে বলেই দিলাম সবার সামনে। কোথাকার কোন হনু ডাক্তার বে? ওই তো শালা গাঁটকাটা প্রদীপ ব্যানার্জিদের সব কারবার। শালা এরাও নিজেদেরকে ডাক্তার ফ্যামিলি বলে। যত সব বেআইনি কাজ। ভবেন মিত্রকে পয়সা খাইয়ে, ওদের বাড়ীরই পেছনের চাতালে তো করেছে ওই আইসিইউ কাম নার্সিং হোম। বললে বিশ্বাস করবিনা ভাই। মঙ্গলবার সকালে সাড়ে দশটায় ভর্তি করেছি কাকুকে আর আজ এই শনিবারে বিকেল পাঁচটার সময়ে বলছে কিনা, আপনাদের বিল কিন্তু এক-আশি ছাড়িয়ে গেছে। আমি না ফাস্ট টাইম তেমনি কিছু বুঝিনি রে ভাই। বেমালুম ঘাড় নেড়ে দিয়েছি। ভাবলাম, ওই মহিলা কিছু জানেফানে না। শালা পাত্তাই দেইনি। বাইরে এসে, ওই সামনের চায়ের দোকানটায় দেখি তোদের বুলনদি বেঞ্চিটায় বসে চোখ মুছছে। আর তোকে কি বলব ভাই? বুলনের চোখে জল দেখে না, আমার এমনি তখন খারাপ লাগতে শুরু করেছে না। মেয়েটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে। আর তুই তো জানিস ভাই, আমাকে সামনে পেয়েই কিন্তু বলছে। আর আমি ছাড়া আর কাকেই বা সব খোলসা করে বলবে বল বুলন? বলে কিনা, এই সাড়েতিন চার দিনেই পয়সা কড়ির এই হালত। তুমি ব্যানার্জিদের কিছু বলো, আর নইলে বাবাকে ভাঙ্গরেই করে দাও।
আরে তুই বল ভাই। ব্যানার্জিদের কি বলব রে আমি নিজের থেকে? ফুল চশমখোর প্রাইভেট মাল। এই আমাদের বাঙ্গুর-ফাঙ্গুর সরকারী কিছু একটা হলে, কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতাম। ওই ভবেনের চিঠিফিঠি নিয়ে লাস্টে হুজ্জুত হাঙ্গামা করে, ও তোদের ভাইয়াদা ঠিক পেসেন্ট ছাড়িয়ে নিয়ে আসতো। অবশ্য যদি তোদের পেসেন্ট টেঁসে না যায়। কিন্তু প্রাইভেটে ও’সব ভাইয়ার দাদাগিরি কিছুটি খাটবেনা রে ভাই। পেসেন্টকে আরামসে ভেন্টিলেটর করে দেবে। পেসেন্ট পার্টি আঙুল চোষো, তখন বসে। তোকে কি বলবে ভাই, তুই’না জানতেও পারবিনা। এমনি সব বিট খচ্চর সব ডাক্তারগুলো।
তোকে আর কি বলব ভাই? গেল মাসের নন্দ’র বাবার কেসটা শুনেছিলি? শালা ভবেনকে তেলিয়ে আর বেহুদা প্রোমোটারি করে নন্দ শালা ভেবেছিল, বহুত শালা পয়সা কামিয়েছে। আড়াই মাসের বাপের চিকিৎসায়ে পাঁচ বছরের ব্ল্যাক মানি না, ফুল ভ্যানিস। লাস্টের দিকে, রাজাদা শালা যত ওকে বলে, ওরে নন্দ। জ্যাঠামশাই আর নেই রে। তুই এবার জুনিয়রটাকে স্ত্রেট চেপে ধর। ওই বড় ডাক্তারটা শালা বিলকুল ঢপ দিচ্ছে – ভেন্টিলেটর ফেন্টিলেটর সব শালা ঢপের চপ। টানা একমাস আটদিন ভেন্টিলেটর! মাজাকি না কি? আরে পাগলা, বিজ্ঞান বলে তো আর ম্যাজিক নয়। শালা আমাদের নন্দটা তবুও মানবেনা। রংবাজী করে বলে কিনা রাজাদা, আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। দেখো শালা তুমি এর শেষ। লাস্টে শুনেছি, শালা বডি ছাড়াতে পারছিল’না। শুক্কুরবারে এক্সপায়ার করেছে আর রোববারে গিয়ে দুপুরে বডি বের করেছে। তাও ভবেন নিজে বন্ডে নাকি সইসাবুদ দিয়েছে। আরে ভাই। কারোর পক্ষেই সম্ভব নয় রে। শেষ দুহপ্তায়ে নাকি প্রতিদিন লাখটাকার কাছাকাছি বিল করছিল। সব মিলিয়ে তিরিশ বত্রিশ লাখ নিয়ে নেমেছে নন্দর বাপ।
করাপসান। বুঝলি ভাই। ফুল করাপসান। এই মেডিকেল লাইনে যা সমস্ত নোংরামি আছে না, তোকে আর কি বলব ভাই। আমার ছোট ভাইঝিটার সময়ে, দাদার তো পুরো প্যান্ট হলদে করে ছেড়ে দিয়েছিল। অবশ্য দাদারা অফিসের থেকে মোটামুটি সবকিছু পায়। কি’একটা কোম্পানির ইনসিওরেন্স ফিনসিওরেন্স থেকে। সে অপারেশানের ছ’সাত মাস পড় অবধি, দাদা সব ফাইলপত্তর নিয়ে রোজ ঘোরাঘুরি। শালা মেয়ের মুখেভাত হয়ে গেল, এদিকে কোম্পানির পয়সা বেরলনা। লাস্টে তো সে শুনলাম, দাদা ইনসিওরেন্স কোম্পানির লোকটাকে পয়সাফয়সা খাইয়ে, তারপরে শেষমেশ নাকি ফাইল বের করেছে। আরে ভাই, দাদা তো বলছিল, ইনসিওরেন্স থাকা নাকি, না থাকার চেয়ে আরও বেশী ঝঞ্ঝাটের। ইনসিওরেন্স করেছ কি, তুমি গেছ। ইন্সিওর দেখে তোমাকে শালা ওই ঢ্যামনা ডাক্তারের ঝাড় আরও বেকসুর কেস দেবে। আরও দামী ওষুধ, আরও কারণে অকারণে ইঞ্জেকশান, আরও শালার ঘনঘন রক্ত পরীক্ষা। শালারা শিরা কেটে রক্ত নেবে, পকেট কেটে পয়সা নেবে।
আর শুধু তোর থেকেই তো নেবেনা রে ভাই। এই ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা ল্যাবগুলো, ওষুধের দোকান, ওষুধের কোম্পানি, কাউকে শালারা ছেড়ে কথা বলবে না। সব শালা চুষে খাবে। আর খাবেনাই না কেন রে ভাই? একটা ডাক্তার হতে নাকি আজকের দিনে দেড় – দু কোটির গল্প। ওই তো আমাদের সামনের বাড়ীর পার্থ সাহা। শালা চণ্ডীগড় না লুধিয়ানা – কোথাকার একটা প্রাইভেট কলেজ থেকে পাশ করে এলো। ওর বাপটা যা দেনা করেছে, ছেলেকে ডাক্তার বানাতে, দশটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় রে ভাই। তারপরে নাকি আবার কানাডা ফ্যানাডা থেকে কি একটা কিডনির ওপর মাস্টার ডিগ্রী করে আসবে বলছে। আমি বললাম, কিরে পার্থদা, দেশে ফিরবি তো? নাকি পাশফাস করে ক্যানাডাতেই থেকে যাবি? আমায় বলে কিনা ভাই, আমাদের দেশ, বিশেষ করে এই পশ্চিমবাংলা তো সোনার খনিরে ভাইয়া। একশো পঁচিশ কোটি ভারতীয়’র আড়াইশো কোটি কিডনি, আর মাত্র হাজার দুয়েক ভাল কিডনির ডাক্তার। পাশ করে নিশ্চিন্তে এসো, দুবছরে বাপের দেনা শোধ করে, তারপরে আর তোদের পার্থদাকে পায় কে?
ওষুধের কোম্পানির টাকায়ে মাসে একটা করে বিদেশভ্রমণ। সে লর্ডসের মাঠে গিয়ে ইন্ডিয়ার টেস্ট ম্যাচ দেখা বলো, দুবাইয়ে শপিং বা মেসি রোনাল্ডোর লাইভ ম্যাচ। মাঝে মাঝে একটু আধটু গা’হাত-পা টিপিয়ে নেওয়া ব্যাংকক সিঙ্গাপুর থেকে। আর ব্যাংককে গিয়ে গা টেপানো মানে তো বুঝতেই পারছিস ভাই। পার্থদা’টা নিজে সব কিছু খুল্লামখুল্লা বলল রে ভাই। ভাই, তেমনি নাম হয়ে গেলে না, বছরে একটা করে নাকি ভাল গাড়ী। স্পোর্টস কার। সব শালা ওই ওষুধ কোম্পানির পয়সায়ে। মনটা না খারাপ হয়ে যায় রে ভাই! এরা শালা শুয়োরের বাচ্চারা গরীব বড়লোক মানেনা, গ্রাম শহর মানেনা, ছেলে মেয়ে বাচ্চা বুড়ো – কিচ্ছু শালারা মানেনা। শুধু পেসেন্টকে টুপি দাও। খড়িগোলা জল ইঞ্জেকশান দিয়ে পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা ক্যাশে নাও। নিয়ে বাড়ী গিয়ে মোবাইল অফ করে বেডরুমে এসি চালিয়ে স্কচহুইস্কি আর তন্দুরি চিকেন মারো।
একবার মনে হয় না রে ভাই! কলকাতার সবকটা এই সেয়ানা টাইপের ডাক্তারগুলোকে না, ফুল ল্যাংটো করে, নানা পাটেকার স্টাইলে, পেরেকওলা বাটাম দিয়ে বেধড়ক্কা ক্যালাই। প্রথমে ধরব ওই আমাদের শালা ব্যানার্জিটা’ কে। শালা বহুত তেল হয়েছে ওই নার্সিং হোমটা নিয়ে। কথায় কথায় শালা সুস্থ পেসেন্টকে নিয়ে ভুল ইঞ্জেকশান দিয়ে, ট্যাবলেট গিলিয়ে, অসুস্থ করবে, তারপরেই শালা ভেন্টিলেটর। তারপরে শালা লাখ চারেক নিয়ে, পেসেন্টপার্টি’র পেছন দিয়ে লালসুতো নীলসুতো বের করে দিয়ে, তবে শালা লিখবে ডেথ সার্টিফিকেট। বলো হরি হরি বোল। কিছু মনে করিস না রে ভাই। আজ না বুলনের চোখে জল দেখে একটু সামান্য রক্ত গরম আছে। অন্য কেউ হলে না, আজ শালা রাত্তিরে তোড়ভাঙ করে দিতাম ওই ব্যানার্জির হাসপাতাল। তোদের বুলনদিটা মাঝখানে এসে যাওয়াতে, কেস একটু নরম করে খেলতে হবে। কাকুর চিকিৎসা আমি তো এইখানেই করাবো, বেষ্ট সরকারী ডাক্তার দিয়ে করাবো, দেখব তোদের ওই ব্যানার্জি কি করে নেয় আমার! দরকার হলে ভাই আমাদের চারটে পাড়া এক করে দেব। ভবেন, শঙ্করজ্যাঠা, রাজাদা – সবকে তোদের এই ভাইয়াদা নিয়ে আসবে এক ছাতার তলায়ে। আরে বোঝ ভাই, এ আমাদের পার্টি পলিটিক্সের বিষয় নয়। এ মানুষের বাঁচা মরার প্রশ্ন। এ আমাদের সকলকে একসাথে মিলে লড়তে হবে। এখানে ভাই, লাল সবুজ গেরুয়া – কোন কালার দেখলে চলবেনা। তুই আমার সাথ দিবি তো ভাই? আছিস তো ভাই ভাইয়াদার সাথে? রাতের দিকে পারলে, ক্লাবে আসিস ভাই। সব কথা হবে একসাথে। রাজাদাকেও বলব আসতে। এখন একটু ওদিকটা দেখি। বুলনটা ডাকছে বোধহয়।
মুম্বই
সেপ্টেম্বর ২০১৮
Leave a comment