জানিস ভাই ৬

জানিস ভাই Ÿ ৬

ভাই, কাল রাত্তিরে কোথায় লুকিয়ে ছিলিরে? ফুল এলাকা শালা এসে গেছিল ট্যাঙ্কের ধারে, তোকে তো ভাই দেখলাম না কোথাও। ভাবলাম তোর বুঝি কিছু পরীক্ষাফরীক্ষা আছে, তাই রাত জেগে পড়াটড়া করছিস। তাই বেকার তোকে আর ডিস্টার্ব করিনি। এদিককার সব ব্যাপার শুনেছিস তো? নিরুপম কাকাকে কাল রাত্তিরে তো তুলে নিয়ে গেছিল লেকথানা। শুনিসনি? আজ সকালে সাড়ে আটটার সময় বাবা শঙ্কর জেঠুরা সব গিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। আর এখন নাকি পুলিশ বলেছে, আগামী ষোল না কি আঠেরো দিন, ফুল কমপ্লিট ঘরবন্দী হয়ে থাকতে হবে নিরুপম কাকাকে। কোনো শালা দেখা করতে পারবেনা, বাইরে বেরোতে পারবেনা। ওদের বাইরেকার গেটের সামনে দুটো হোমগার্ড দেখলিনা? ওই দুটো কন্টিনিউ বসে থাকবে। দিনভর। হার্টের পেসেন্ট বলে, সপ্তাহে একটা করে ডাক্তারি চেকিং। তুই বল ভাই, ছেষট্টি বছরের বুড়ো লোকটাকে ধরে, কি বেকার হয়রানি। প্লাস তুই ভেবে দ্যাখ। একটা সিরিয়াস হার্ট পেসেন্ট। সাধনদা বলছিল, কাল রাতে থানার ওই বেঞ্চিতে বসে বসেই নাকি নিরুপম কাকার টানফান উঠে গেছিল। তারপর পুলিশের এক লেডি ডাক্তার এসে দুটো পরপর ইঞ্জেকশান দিলো।

জানিস ভাই। সকালে দাদা’কে তো ফোন করে বললাম কালকের কেসটা। দাদাটা তো শালা বিশ্বাসই করতে চায়না। আর বৌদিটা বলছে, একটা আইবুড়ো লোক, ষাটের ওপরে বয়েস, সারাটা জীবন পাজামা আর সার্ট পরে, বিঁড়ি খেয়ে, বাড়ী বাড়ী লিফলেট বিলি করে, লেবার ইউনিয়ন করে কাটিয়ে দিলো। সে লোকটাকে আনতাবড়ি ধরে এমনি ফাঁকায়ে পুলিশের হয়রানি? বলে কিনা নকশাল, মাওবাদী। তুই বল ভাই। কারুকে এমনি দেখে কিছু বোঝা যাবে? শুনলে বিশ্বাস হবে তোর? শঙ্করজ্যাঠা তো কাল রাতেই পুলিশের সাথে বেশ বাওয়াল করছিল। বেশ উঁচু গলায়। বলে, আপনাদের হাতে কি সাক্ষ্যতথ্য কি প্রমাণ আছে, দেখান আমাদের। তেমনি কিছু ছিলনা রে ভাই। শুধু নাকি একটা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের সইকরা একটা সরকারী কাগজ। কোথাকার শালা ম্যাজিস্ট্রেট, কে জানে?

তুই বল ভাই। আমাদের নিরুপমকাকা। আমাদের পাড়ার ট্রেড ইউনিয়ন লিডার। সারা জীবন শালা বিয়েশাদি করলনা। ভারীভারী বইখাতা পড়ল, রাতরাত গিয়ে ট্যাঙ্কের ধারে ওই উড়িয়াপট্টিতে গিয়ে লোকগুলোর দেখভাল করল, লেখাপড়া করাল, ঝামেলা মেটাল। সে লোকটা নাকি আজ পুলিশের খাতায়ে নকশাল। ফুল ডিটেকটিভ স্টোরি’রে ভাই। সে নিরুপমকাকা নাকি, কোন শালা চোরাপথে সব লোকজন জোগাড় করে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টকে ডাউন করে দেবে। এতো নাকি বিশাল ক্ষমতা আমাদের পাড়ার লিডারের। শালা বাঙ্গুরে একটা বেডের জন্য, সেদিন রাজাদাদের কাছে এসে তদবির তদারক করে এসেছে। সে নাকি এতোটাই বড় সেয়ানাপন্থী, যে গোপনে আকস্মিক অভ্যুত্থান করবে। আমি বলছিনা রে ভাই। ওই রাজাদাটা খেজুর করছিল কাল রাত্তিরবেলা। মালটা বাবাকে বলে কিনা, জ্যাঠামশাই – এ বাজারে কাউকে বিশ্বাস করা যায়না। কে কখন আকস্মিক অভ্যুত্থান করে? কার ভিতরটায় কি লুকিয়ে আছে, না আপনি জানেন, না আমি জানি। বাবাও ভাল দিয়েছে রে ভাই। বলে, সে আর বলতে। কে টেরোরিস্ট, কে নকশাল, কে ধার্মিক, কে সাম্প্রদায়িক, সে কি আর আমরা জানি ভাই? আমরা কি তোমাদের মতন অতশতও পলিটিক্স বুঝি? তবে নিরু আমাদের ছেলেবেলাকার বন্ধু, আমাদের থেকে বছর চারেকের ছোটই হবে। আমাকে আর যাই বল ভাই, নিরুকে চিনিয়ে দিয়ো’না ভাইটি। মুখের মতন জবাব দিয়েছে বাবা। বল ভাই।

অনেক ভেবে দেখলাম রে ভাই। নিরুপম কাকাটার তেমনি কোন দোষ বলে কিছু নেই কিন্তু। ওই উড়িয়াপট্টিতে গিয়ে সন্ধ্যের দিকে গোটা দশেক মিলের লেবারগুলোকে চাট্টি গা-গরম কথা বলেছে হয়ত। বড়বড় বাতলিং তো লোকটার ছিলই। তোর মনে আছে ভাই, সে একবার বিজয়া সম্মিলনীতে ষ্টেজে উঠে কি ভাঁটটাই না করেছিল? সামাজিক অসাম্য, সামন্তবাদবিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল বিধিবিধান, কেন্দ্রের নৈরাজ্যবাদী চক্রান্ত। আমরা তো সেই লাস্টে বসে, সে কি বেকার হাসাহাসি। নাম না করে, ষ্টেজ থেকেই রাজাদা’দের বলেছিল ধর্মান্ধতা আর উগ্র-জাতীয়তাবাদের অবস্থানে সুদৃঢ় থেকোনা। সে শুনে, রাজাদারাও কি সব আলফাল খিস্তিও করেছিল নিরুপম কাকাকে। আসলে কি জানিস ভাই? এই তোদের ভাইয়াদার মুখে লাখ কথার এক কথা শুনে রাখ ভাই। জোর যার, মুলুক তার। গদিতে যে সেয়ানা যখন বসে আছে, ভালোয় ভালোয় তার কথা শুনে চল ভাই। ওই ঢপের বিরোধ-ফিরোধ মাড়িয়ো না। ওসব মাজাকি করোনা। বেকার কেস খাবে। এমনি বাটামের বাড়ি দেবে না, যে শালা চারমাস ভালভাবে হাঁটতে পারবেনা। ওই গদির সেয়ানাই না সবচাইতে বড় সেয়ানা। পুলিশ ফুলিস, আইন আদালত, সব শালা বাঁ পকেটে নিয়ে ঘোরে।

আরে আমি তো বলছি ভাই তোকে। নিরুপমকাকা ফুল কেসটা খেলো, ওই কি একটা লিফলেট না কি বার করেছে না। ওই কি সব একটা লিখেছে না – ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে সঙ্ঘের দৃষ্টিভঙ্গি না কি একটা ঢপের হুলতাল। হুজুগে পরে আরও লেখো শালা। কারা যে শালা নিরুপমকাকাকে এই বয়েসে বাড় খাওয়াল, কে জানে শালা? শালা হিন্দু, মুসলিম, গান্ধী, হিটলার, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধফুদ্ধ নিয়ে সে এক বেমক্কা খটমট ব্যাপার রে ভাই। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সাথে মিলে নাকি গান্ধী কাজ করতে চাইলে, সঙ্ঘ নাকি সেটায় বাধা দিয়েছিল, নিরুপমকাকার লেখা। জানাও শালা আরও তোমার বক্তৃতা, লেখো শালা আরও ঢপের কীর্তন। এখন বোঝো শালা কাকে বলে পুলিশের হুল। বাড়ীতে বন্দী হয়ে থাকও শালা যদ্দিন না কেস যাচ্ছে কোর্ট। এ কেস ভাই, বাবা বলছিল, বড় কেস। সহজে ছাড় নেই। অনেক উঁচুতলায়ে গিয়ে এ কেস ছাড়িয়ে আনতে হবে।

শালা গত রাত্তিরে পুলিশটা নিরুপম কাকাকে জিজ্ঞাসা করছে, কি করা হয় আপনার? নিরুপমকাকাটা ফুল ঢ্যামনের মতন বলছে, আমি একটি অরাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী, সখের লেখক ও বিভিন্ন সমাজসেবা মূলক কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে থাকি। কত ইনকাম করেন? পুলিশটা জিজ্ঞাসা করছে। বলে, ধারদেনা করতে হয়না ভাই, বাড়ীভাড়ার থেকে দেড়হাজার মতন টাকা পাই মাসে মাসে। আর খরচ বলতে তো শুধু হাঁপানির ওষুধ আর সামান্য পেট চালানোর সংস্থান। আমি যত করে বাবাকে বলছি ভাই, খোঁচরটাকে সাইডে নিয়ে যাও তোমরা, হাতে হাজার পাঁচেক গুঁজে দাও। সব কেস হাল্কা হয়ে যাবে। বাবারা শালা শুনলইনা। নিরুপমকাকার সাথে তালে তাল মিলিয়ে বাবা আর শঙ্করজ্যাঠা ততক্ষণে শুরু করে দিয়েছে সব ঢপের চপ। ওই যেগুলো সব, ক্লাবে কিছুদিন আগে অবধিও চলত – শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, শ্রমিক উন্নয়ন, স্বনির্ভরতা, কর্মসূচি পালন, দুঃস্থ ছাত্রদের দেখাশোনা। যতো সব ন্যাকামি, বুঝলি ভাই?

কে বলেছে তোমাদের এই সঙ্ঘ-ফঙ্ঘর ব্যাপারে কথা বলতে? তুই বল ভাই। ট্যাঙ্কের ধারের ওই জমিটাতে, রাজাদা তখন ফাঁকায়ে খিস্তি করে যাচ্ছে। ওই মালটা কি বুঝবে বল ভাই তোমাদের ওই গালভরা বুকনি? সমাজতন্ত্র, উদারতাবাদ, সাম্যবাদ, ডানপন্থী রক্ষণশীল, গণতান্ত্রিকের বিরোধী। সব শালা আলফাল ঢপবাজি। ওই বললাম না ভাই, এগেন্সটে কিছু বোলনা। এগেন্সটে গেছ তো শালা মরেছ। ভাই মনে আছে, হীরক রাজার গল্পটা? সকলে কেমনি করে, ছড়া করে, পদ্যও করে ডায়লগ বলছে, শুধু ওই পাঠশালার পণ্ডিতমশাইটা ছাড়া? পরে বাবা বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিল, ওই দেশটাতে ভাই, সবকটা ওই রাজার পেটোয়া। রাজার ধামাধরা। একমাত্র উদয়ন পণ্ডিতটা ছাড়া। মনে আছে ভাই, রাজার গবেষককে দেওয়া ডায়লগটা? বলছে, গবেষক, গবচন্দ্র, জ্ঞানতীর্থ, জ্ঞানরত্ন, জ্ঞানাম্বুধি, জ্ঞানচূড়ামণি! কি ডেঞ্জার লোক বল’তো ভাই হীরক রাজাটা? সেই উদয়ন পণ্ডিতটাই তো লাস্টে স্লোগান তুলল, দড়ি ধরে মার টান, রাজা হবে খান খান!

যাকগে ভাই! অনেকক্ষণ হ্যাজালাম তোর সাথে। ওই ওদিকে আবার রাজাদা ফুল টীম নিয়ে আসছে। আমার সাথে কি কথাবার্তা হচ্ছিল জিজ্ঞাসা করলে আবার কিছু আলফাল বলিস না ভাই। আমার আবার আগামী সপ্তাহে, ধর্মতলার একটা কোম্পানিতে একটা ইন্টারভিউ আছে। আমি আবার এসব বলেছি শুনলে, অন্য কেস না হয়ে যায়।

মুম্বই
অগাস্ট ৩১, ২০১৮

Leave a comment