জানিস ভাই # ৫
ভাই, মনটা ভাল নেই রে একদম! হঠাৎ করে কেমনি যেন মনে হচ্ছে, শালা ওয়ার্ল্ড কাপটা না, বড্ড জলদি করে শেষ হয়ে আসছে রে ভাই। এই যেমন দ্যাখনা তোর, সবাই মিলে কেমনি এই সন্ধ্যে আটটা থেকে নিয়ে বসে, সেই মাঝরাত্তির দেড়টা দুটো অবধি ক্লাবে একসাথে খেলা দেখছি। আর তো মাত্র হাতে গুনে কটা দিন রে। তারপরে দেখবি ভাই, সব কেমনি চুপ মেরে যাবে। আবার শালা সব যে কে সেই! আর এখন দ্যাখ ভাই, কি হুল্লাট মস্তিটাই না হচ্ছে! শালা মাঝরাত অবধি খেলা দেখো রে, শেষরাত অবধি সেই খেলা নিয়ে খেজুর করো রে, তারপর পরদিন দুপুর অবধি টানা ঘুমোও রে। তারপর আরও আছে ভাই। খেলার মধ্যেমধ্যে, ফ্রী’তে ঝুমুরবৌদির হাতের চপমুড়ি খাও রে। তোদের কেমনি ফিলিং হচ্ছে, জানিনা। তবে আমার কিন্তু হেবি লাগছে রে ভাই। কেমনি যেন মনে হচ্ছে, আমরা এই গোটা পাড়াটা যেন একটা বিশাল জয়েন্ট ফ্যামিলি। সেই ‘হাম আপক্বে হ্যাঁয় কউনের’ মতন। ফুল পাড়া যেন হঠাৎ করে ভাই-বন্ধু হয়ে গেছে রে। তবে ভাই, শুধু না একটাই বিলা কেস। ওই একবার সাড়ে সাতটার সময়, মিতুলটাকে সাইকেলে করে বাসস্টপে নামিয়ে দিয়ে আসা। তারপরে ফিরে এসে, আবার বিন্দাস লম্বা হয়ে যাও। তারপরে বারোটা সাড়ে বারোটা অবধি না ভাই, ফারদার কেউ তোমায় কোন ঝামেলা দেবেনা।
আর দেবে কে বে? মা মেজমা’র কোনোকালে সে হিম্মৎ ছিলোওনা, হবেও না। আর এখন তো বাবা, মেজকাকাও রাতফাত জেগে দশটা-ফসটা অবধি নিজেরাই লাট খাচ্ছে। তবে কি জানিস ভাই, হিম্মৎ ছিল কিন্তু একমাত্র বউদির। সে তুমি যত রাতই করো, আটটার মধ্যে তোমাকে বিছানা ছাড়তেই হবে। ছোটকাকারা না ভাই, ওই আলাদা হয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে, বউদিই রেগুলার করে না আমায় ঘুম থেকে উঠিয়ে দিত। তা সেসব ছাড় ভাই। ভাই তুই বাবাদের সকলকে ক্লাবে দেখছিস? দেখে কেউ বুঝবে বল ভাই। সুবিমল কাকাকে? তুই বল ভাই। শালা মাসে দু দুটো কেমো চলছে চারমাস হয়ে গেল। শঙ্কর জ্যাঠাকে দেখে কেউ কি বলতে পারবে, গতবছর এমনি ভাবে অজয়’টা ওরম অফ হয়ে গেল? ভাই, সবকটা বুড়ো সুডডা না, সন্ধ্যে হয়েছে কি হয়নি, ক্লাবের মধ্যে এসে, দুটো মশার ধুপ জ্বালিয়ে, ফুল বেঞ্চি গরম করে বসে যাচ্ছে। আমাকে তো সেদিনকা সুবিমলকাকা বলে, যা না রে ভাইয়া, কাউকে দিয়ে গনার দোকান থেকে একটু লেবুচা আনা। তারপর বলে কি, পয়সা আমার নামে লিখে রাখতে বলবি গনাকে। তারপর সে গনার দোকানের বিটনুন মারা লেবুচা খেয়ে, সেকি কি ফুর্তি বুড়োর। এদিকে বাবারা লেবুচা মারছে, আর ওইদিকে দাদা’দের গ্রুপটাকে দেখছিস ভাই? শালা, দাদাটা ভাগ্যিস নেই এখানে। সবগুলো এমনি বেকার নেশা করছে না, সেকেন্ড ম্যাচ’টা তো অনেকে শালা কিচ্ছু ধরতেই পারছেনা, শালা ফুটবল না ক্রিকেট। ভাই ঘড়ীতে বারোটা বাজল কি না বাজল, সবকটা না, মাল ফাল খেয়ে ফুল লোড। ফুল ধুর হয়ে যাবে রে ভাই। বললে বিশ্বাস করবিনা ভাই। সেদিন রাতের স্পেনের ম্যাচটা দেখে, বাবুয়া’দা বলে কি ভাই, মেসিটা না বহুত সেয়ানা। আজ ব্যাটা লাল কালারের জার্সি গায়ে দিয়েছে। তারপরে গৌতমদা’দের দিকে উঠে বলে কি, অ্যাই শালা গরু-পার্টি, তোদের গোল মারলে শালা, লালই মারবে। ও’তোদের নীল-সাদার দ্বারা কিস্যু হবেনা। আর সে শুনে, শঙ্করজ্যাঠার কি খেই খেই করে হাসি রে ভাই!
আমি তো ভাই, সত্যি বলছি রে ভাই। খেলা দেখছি কম, কাওতালি দেখছি বেশী। দাদাদের গ্রুপটা না হয়, তেমনি সিনিয়র কিছু নয়। তুই বাবাদের গ্রুপটাকে শুধু দ্যাখ ভাই। কি ডেঞ্জার মুখের ভাষা রে ভাই! সাধনকাকার মতন অমনি গাম্ভীর্য টাইপ লোক ভাই। সেদিনকা রাশিয়া না কার একটা বেশ ফাউল দেখে, সে কি হুরুমতাল খিস্তি! সে তোকে কি বলব রে ভাই। ‘ব’, ‘ল’, ‘চ’ – সে একেবারে মুখে সব বিষাক্ত খই ফুটছে রে। তারপরে বাবা না কে একটা বেশ, গলা নামিয়ে কি একটা বলল, তবে না সেই সাধনকাকা চুপ হল। কি জানিস ভাই, এই বিশ্বকাপ ফিস্যকাপ না, তেমনি কিছু বড় ব্যপার না রে। আসল হল ভাই, সব এই একসাথে একজুট হয়ে বসা’টা। চা খাওয়াটা এমনি তেমন কিছু নয় রে ভাই। সে তো আমরা ভাই সকাল বিকেল, রোজই খাচ্ছি। আসল মজাটা কিন্তু হল, যখন ক্লাবে বসে, সবাই মিলে গনার লেবু চা, দুটো’কে চারটে, কি তিনটে’কে ছ’টা করে খাচ্ছে। কি তোকে বলব রে ভাই, ছোট-বাপিন’টা না, ওই ওষুধ কোম্পানির কাজ নিয়ে ভুবনেশ্বর বেরিয়ে যাবার পর, আমার না, আর সন্ধ্যের দিকে ক্লাবে আসতে মন লাগেনা রে ভাই। সব কেমনি যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
ভাই, বিঁড়ি সিগারেট গোটাটা কোনোদিন ছোট-বাপিন’কে ছাড়া খাইনি কিনা। কি জানিস ভাই, সিগারেটের কাউন্টার খাওয়াটা কিন্তু, পয়সা বাঁচানোর জন্য নয় রে ভাই। ও একটা ভালবাসার জিনিষ। ও অনেক আচ্ছা-তাচ্ছা পাবলিক বুঝবেনা রে ভাই। শালা এদিকে দাদা বউদিটা’ও নেই বাড়ীতে। জানিস ভাই, পিকলু’টা না, সারাটাদিন বারান্দায় খেলে বেড়াত ব্যাটবল নিয়ে। বেশ ভাল খেলে রে ভাই। হাতে কিন্তু খেলা আছে ব্যাটার। আমাদের ভাঁটার মাঠে অনেকে তো বলত, কাকার মতন ব্যাট। ন্যাটা। তা সে ছোটমা’টা তো পিকলুটারও আমাদের এখানে আসা মানা করে দিয়েছে। আর দাদারও তো ক্লাবে আসা মানে, ওই মাসে একবার। তুই বুকে হাত দিয়ে বল ভাই, এই এত বড় বিশ্বকাপ’টা হয়ে যাচ্ছে, দাদাকে ছাড়া দেখতে কেমনি বেকার লাগে? নারায়ণদা তো সেদিন বলেই দিলো খেলা দেখতে দেখতে। ভাল বলছে কিন্তু ভাই। বলে কিনা, ভাইয়া, এবার তকাই’কে বল। পয়সাকড়ি জমিয়ে নেক্সট বার মিতুলকে, তোকে আর পিকলু’কে নিয়ে কাতার ঘুরে আসবে। হ্যাঁরে ভাই। বাইশের বিশ্বকাপ’টা কাতারে, তাই না? দেখি শালা, বলব দাদাকে। আমার আর মিতুলের সব কথাই তো এতদিন রেখেছে। এটাও নিশ্চয়ই সিওর করে রাখবে। নয়ত যে করে হোক ভাই, তোদের আশীর্বাদে, দাদা বৌদিকে বাড়ী ফিরিয়ে আনব আমি আর মিতুল।
ভাই, এই ফ্যামিলির মধ্যে ভাইয়ে-ভাইয়ে কেসটা না আমি নিতে পারছিনা রে। বাবা-ছোটকাকার মধ্যে এই দোকান’টা নিয়ে ঝামেলাতে, কি যে সব ফালতু ওলটপালট হয়ে গেল, কি বলব তোকে ভাই। আমি আর মিতুল কোনোদিন দাদাকে খুড়তুতো দাদা হিসেবে দেখেছি? বল তুই ভাই?সবাই তো পাড়ায়ে একটা টাইমে বলত, দেখতে হয় তকাই-ভাইয়াকে। যেন আমাদের বুড়োশিবতলার রাম – লক্ষণ। কোথা থেকে যে শালা এই দোকানের মামলাটা বেকার ঘাড়ে এসে গেল? জানিস ভাই, ওই শালা ছোটমা’র ভাইটা। শালা বিট-খচ্চর। ছোটকাকাকে কি যে ভূগোল ইতিহাস পড়াল লোকটা! এখন শালা কেসফেস জিতে, মালটা বিকেলের দিকে ডেইলি কে ডেইলি এসে দোকান সামলায়। মেজকাকা কি বলে জানিস ভাই? বলে, এতো ফুল ইন্ডিয়া পাকিস্তান, চীন তাইওয়ান কেস। দুটো পাশাপাশি দেশে, ইতিহাস ফিতিহাস নিয়ে, ধর্ম ফর্ম নিয়ে লাগবে কিছু বেকার লাফড়া। আর সঙ্গেসঙ্গে শালা বন্ধু সেজে চলে আসবে তোর ওইসব বাইরেকার দেশগুলো। ব্যাস লাও, সামলাও। একটা দেশ তোমাকে সাপোর্ট দেবে, তো অন্য একটা দেশ তোমার ভাইকে।তবে যাই বল ভাই। বাবাদেরও কিন্তু দোষ আছে আঠেরো আনা। সেই ব্যাটা কবে থেকে দেখছি। মা – মেজমা ভার্সেস ছোটমা। ভাই, কি বলব তোকে, ফুল ডে বাড়ীতে চুদুর-বুদুর। মা’রা হয়ত চুপ করল দশ মিনিট, তো ফের পাগলার মতন শুরু হয়ে গেল বাবা মেজকাকা ভার্সেস ছোটকাকা। কি না, দোকানের ক্যাশ বাক্সের চাবি নিয়ে। শালা দু’পয়সার দোকান, দশ পয়সার ক্যাশ, সেই নিয়ে ভাই গোটাদিন ফাঁকায় বাওয়ালি। তারপর আরও কি জানিস ভাই, একে অন্যকে রীতিমতন রেষারেষি। শালা একসঙ্গে খেতে বসে কেস দিচ্ছে একে অন্যকে। বেহুদা কেস ভাই। জালি কেস। সে তোকে ভাই ঘরের সব কি বলব? বললে তুই বিশ্বাস করতে পারবিনা রে। কি শালা ডেঞ্জার সব স্টোরি!তারপর জানিস ভাই, একদিন না বউদি আর দাদা ডাকল আমাকে আর মিতুলকে। ছাতে। বউদি তো আসলে ভাই ইংলিস মিডিয়াম ছিল। আমাদের দুটোকে সিব্লিং – ফিব্লিং নিয়ে কি সব ডানদিক বাঁদিক জ্ঞান। আমি তো ভাই, ফাস্টে ভেবেছি – বউদি বলছে শিবলিঙ্গ। তারপরে ওই মিতুলটা কনুই করে বলল, নারে ভাইয়াদা। সিব্লিং মানে হচ্ছে ভাই। আপন মায়ের পেটের ভাই। আমি ভাই ততক্ষণে যা বোঝার, সব বুঝে নিয়েছি রে। জানিস ভাই, ঠিক করেছি, বিয়ে সাদি করব না রে। ওই শালা বিয়েতেই মেন লাফড়া। আর করলে, না ভাই, ওই তোদের বুলন’দি’কেই করব। আজকাল শুনলাম বুলনটা বৌদির কাছে ইংলিস পড়তে আসে রেগুলার। বাইশের মধ্যে ওই বুলনটা কে দিয়েই সব মিটিয়ে নিতে হবে রে ভাই। নেক্সটবারের বিশ্বকাপটা না, দাদাকে ছাড়া দেখবনা আমি আর মিতুল… আর যদি ভাই সঙ্গে বুলনও থাকে, তবে তো শালা সোনে পে সুহাগা! কি বলিস ভাই? হাঁটাও শালা মেসি ফেসি, রোনাল্ডো ফোনাল্ডো… আমি দাদা, মিতুল – আর সাইডে বৌদি আর বুলন। বাড়ীর বাকী সবকটাকে রেডকার্ড দেখিয়ে বার করে দাও ব্যাটা মাঠের বাইরে। জমে যাবে ভাই বাইশের বিশ্বকাপ… মিলিয়ে নিস তুই।
মুম্বই – জুলাই ৪, ২০১৮
Leave a comment