বগা – বগীর গল্প
কল্পনাদিদি খুব ভাল গল্প বলে। অনেক’কটা গল্প তো দাদুর থেকেও ভাল। দাদুর পেটের উপর বসে অনেক গল্প শুনেছে বুড়ো। তবে দাদুর গল্পগুলো কেমন যেন তুতু, ভুতু দিয়ে শুরু হয়ে, ধীরেধীরে গিয়ে শেষ হয় ম্যাগাভুত, কিল্লিভুতের কাছে গিয়ে। শীতকালে একটা জলের বালতিতে রোদ্দুর পড়ে দেওয়ালে একটু আয়নার খেলা চললেই বুড়ো ভাবে এই সেই দাদুর কিল্লি ভুতটা এলো বুঝি। দেওয়ালের ওপর ওই সাদা সাদা চকচকগুলোই বুঝি ম্যাগা ভুতটার কারবার। বেলা এগারোটাতেই ভয় পেয়ে যায় বুড়ো। একা ওই কোনের বাথরুমটাতে যাওয়াও তখন মুশকিল। কোনওরকমে আদ্ধেক বাথরুম সেরে, জলটল কিছুমাত্র না ঢেলেই, এক ছুটে পালিয়ে বাঁচে বুড়ো।
ম্যাগাভুত, কিল্লিভুত ছাড়া অন্য কিছু গল্প বলতে গেলেই, দাদু শুরু করে কি একটা বগা-বগী’র গল্প। আর সে’এক মর্মান্তিক ব্যাপার। ছোট্ট একটা বগী। দাদু বলে পঙ্খী। সে পঙ্খী নাকি আবার চোখে কিচ্ছুটি দেখতে পায়না। বগীরটা’র বাবা বড়-বগা ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়েছে দিনের খাবারটুকু জোগাড় করতে। সেদিন আবার খুব ঝড়জলের দিন। দুপুর অবধি ছোটবগী আর তার মা’বগী উপোষ করে বসে আছে, বাবা-বগা’টা খাবার আনবে বলে। বেলা আরও বাড়ছে। বাবা-বগা এখনও খাবার নিয়ে এলনা। খানিক বাদে মা-বগীটা আবার খুঁজতে বেরোয় বগাকে। আর ঠিক তখন বেচারি ছোটবগী’টা গাছের মধ্যে এক্কেবারে একলা। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে আসে, সূর্য অস্ত যায়, তাও বগীটার মা ফিরে আসেনা। সন্ধ্যের পর গাছটার নিচে, একটা অজানা গ্রামের ফকিরবাবা একটা গান ধরে – ‘উড়িয়া যায় চখুয়ার পঙ্খী, বগীক বলে ঠারে, ও তোমার বগা বন্দী হইসে ধল্লা নদীর পারে রে… ও বগা বাড়ীতে আয়…’। খুব বিমর্ষ সুর ফকিরবাবার সে গানটার। বড্ড কান্না পেয়ে যায় বুড়োর আর সাথে গলাটা ব্যাথা করে ওঠে। তারপরে অবশ্য বুড়োর আগেই দাদুর নিজেরই চোখ ছলছল করে ওঠে। সন্ধ্যে বেলায় মা বাড়ী ফিরে বুড়োকে নিতে আসা অবধি মনখারাপটা চলতেই থাকে বুড়োর।
তার চেয়ে বরং কল্পনাদিদি অনেক ভাল। মা সকালে বেরিয়ে গেলেই খুব তাড়াতাড়ি সব কাজকম্ম সেরে ফেলে কল্পনাদিদি। তারপরে শুরু করে দেয় গল্প। দাদুও তখন কীসব হিসেব লেখালেখির কাজ করতে বসে মোটা একটা সবুজ ডায়রি নিয়ে। কল্পনাদিদির গল্পগুলো সত্যি ভাল। গল্পগুলোয় বর থাকে, বউ থাকে, খারাপলোক, ভালোলোক, ঝগড়াঝাঁটি সব মিলিয়ে এক একদিন খুব জমিয়ে দেয় কল্পনাদিদি। তবে দাদু এসে পিছনে দাঁড়ালেই ভড়কে গিয়ে চুপ মেরে যায়। সেদিন কিন্তু দাদু রেগেও গেলো বেশ। কল্পনাদিদি বলছিল একটা দারুণ মারামারির গল্প। একটা নদীর ধারে নৌকোর মধ্যে ভীষণ মারপিট চলছে দুটো লোকের মধ্যে। একটা ভাল লোক আর একটা বেজায় দুষ্টু। সেটা নাকি গাঁয়ের জমিদার। অন্যদিকে গাঁয়েরই একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মারপিট দেখছে আর খুব হাপুসনয়নে কাঁদছে। চোখের পলকটুকু না ফেলে গল্পটা মন্ত্রমুগ্ধের মতন শুনছিল বুড়ো। কল্পনাদিদিদের নিজেদের গাঁয়ের গল্পই হবে। মারপিটে জিতে গেলো ভাল লোকটা, আর তারপরেই মেয়েটা কান্না থামিয়ে একটা সুন্দর গান গেয়ে উঠল। কল্পনাদিদি গানটা নিচু গলায় ধরতেই, সেক্রেটারিয়ট টেবিলটা থেকে হিসেব লেখার কাজ ছেড়ে উঠে এলো দাদু। তখন বুড়ো আর কল্পনাদিদি দারুণ মেজাজে। বেশ সুর করে চোখ বুজে গাইছে কল্পনাদিদি, “ছেড়োনা ছেড়োনা হাত, দেবনা দেবনা তো যেতে, থাকো আমার কাছে”। আর বুড়োরও সাঙ্ঘাতিক লাগছিল গল্পের এই জায়গাটা। নৌকোর মধ্যে মারামারি, জলের মধ্যে দুষ্টু লোকটার ঝপাস করে পড়ে যাওয়া আর তার পরেই একটা দারুণ গান।
সবুজ ডায়রিটা খাটের উপর ছুঁড়ে দিয়ে দাদু যা জোরে বকে উঠল কল্পনাদিদিকে, তাতে পাশের বাড়ী থেকে টুলটুল মাসীও একবার উঁকি মেরে দেখে গেলো। “কতবার বলা হয়েছে না তোকে, ফিলিমের ওইসব হাবিজাবি গল্পগুলা বাড়ীতে করবিনা।” মাথা নিচু করে কল্পনাদিদি বলে, “মিঠুনদার বই গো মেশমশাই, গেরামে চলছে, রোজিনা আছে… অন্যায় অবিচার”। কি দারুণ গল্পটা লাগছিল বুড়োর, কি সুন্দর জমে উঠেছিল। দাদুটা যেন একটা কি। নিজে সব বগা-বগীর গল্প বলবে, নিজেই ভেউভেউ করে কাঁদবে, আর কল্পনাদিদি একটা ভাল কিছু বলতে গেলেই ধুমধারাক্কা বকুনি খেতে হবে। আজ মা ফিরলেই সব বলে দেবে বুড়ো। দাদুর কি দরকার কল্পনাদিদিকে বকার? মা তো সকালবেলা কল্পনাদিদিকেই যা বলার বলে যায়। দাদুকে তো আর বলেনা। ভারি রাগ হয়ে যায় বুড়োর। রাগ করে টুলটুল মাসীদের ঘরে ঢুকে আসে বুড়ো।
রাংতার মতন একটা লাল গোল চাকতি নিয়ে খেলতে খেলতে টুলটুল মাসীদের বাড়ীতে বুঝি ঘুমিয়েই পড়েছিল বুড়ো। দাদুই ডেকে তুলল। কল্পনাদিদি ততক্ষণে ভাত মেখে দিয়েছে। ছোট চারা মাছ। মাছের কাঁটা বেছে দিতে দিতে দাদু বলল, “মাছটা খেয়ে নাও দাদু, খুব ভাল মাছ। আর এই মাছ টুকুনের জন্যই কিনা বগার এত আপদ।”
গম্ভীর মুখে বুড়ো বলে, “দাদু! বগারা মাছ খায়?
“বাহ! মাছ খাবেনা? বগারা শুধু মাছই তো খায়।”
“বগা আর মা-বগীটা কি মরে গেলো দাদু?”
দাদু হেসে বলে, “নারে বুড়ো। মরবে কেন? ফান্দে পড়েছিল। বগাদের জান বড় কড়া। অত সহজে কি মরে?
“তবে শেষে কি হল দাদু?”
“ওই তো কল্পনাদিদি তোমাকে পুরো গল্পটা বলে দেবে না হয়। আমি শেষ অবধি জানিনা কিনা”।
গল্পটা শেষ অবধি শেষ করল ওই কল্পনাদিদিই। পুঁটীমাছ ধরতে গিয়ে নাকি বাবা-বগাটা মাছের জালে পড়ে গিয়েছিল আটকা। পুঁটী দেখে খুব লোভ করেছিল কিনা! তা যার যেমনি কর্ম তেমনি ফল। ধল্লা নদীর বুকে বোকা বগাটা উড়াল দিয়ে পুঁটীটা ছোঁ মারতে গিয়েই ধরা পড়ে গেলো জালের মধ্যে। লোহার জাল। তারপরে শেষ অবধি সেখানে গিয়ে বিকেল বেলায় উপস্থিত হল মা-বগী’টা। অনেক মারামারি কাটাকাটি করে ছাড়িয়ে লোহার সুতোর থেকে ছাড়িয়ে নিলো সে বগাকে। তারপরে দু-দুখানা পুঁটীমাছ ঠোঁটে ধরে তারা দুজনেই অনেকটা উড়াল দিয়ে ফিরে এলো বাচ্চা বগীর কাছে। তারপর তারা খুব আরাম করে পুঁটীমাছ খেতে লাগল। সত্যি কল্পনাদিদি গল্পটা ভালই বলে। কি সুন্দর বাবাবগা আর মাবগীটা ফিরে এলো বাচ্চাটার কাছে। আনন্দে কল্পনাদিদিকে জড়িয়েই ধরল বুড়ো। মা বাইরে থেকে ফিরে এসেছে ততক্ষণে। আজ অনেকদিন বাদে সাথে বাবাও এসেছে। দাদু তখনও সবুজ ডায়রিটার ওপর টুলটুল মাসীদের বাড়ী থেকে কুড়িয়ে আনা লাল রাংতার মতন গোল চাকতি’টা বসিয়ে কি সব আবোল তাবোল ভেবে চলছে। দাদুটা সত্যি ভাল গল্প জানেনা।
Leave a comment