জানিস ভাই # ৩
ভাই! দেখলি সেদিন? মেসি’টা কি বেহুদা মিস’টাই না করল? ফুল ঝোলাল রে ভাই। আরে পাগলা শালা, পেনাল্টি’র শট, অমনি ভাবে আনকা কেউ ভাসায়? আকাট মালটা। একটু বুঝে মার। আমি কিন্তু জানিস তো, শুরু থেকেই জানতাম রে ভাই। আমাদের যত এই মেসি-মেসি চিল্লাচিল্লি, সাদা নীল পোস্টার পতাকা, ক্লাবে এসে বিনা মতলব গা-জোয়ারি, তত কিন্তু বেকার চাপ। কি বলব তোকে ভাই, আমাদের বাবুসোনা তো পেনাল্টি’টা না, পোস্টের ওপর দিয়ে না, ভেসে বেরিয়ে যাবার পর, সে আমার হাঁটুফাটু ধরে কি ফুঁপিয়ে কান্না? আরে পাগলা, আমি আর ছোট-বাপন যত ওকে বলছি, ধুর বোকা, মিস করেছে তো মেসি, তো শালা তোর বাপের কি? আর যেমনি খিস্তি করছি বাবুসোনাকে, ভাই, শালার তেমনি ফোঁপানো বেড়ে যাচ্ছে। কি বলব ভাই তোকে, দেখলই না ব্যাটা ফুল ম্যাচটা। লাস্টে গিয়ে পেছনের চাতালে গিয়ে শুয়ে আছে। বলে কিনা, তোরা দেখ, আমি মেসির জন্য অপয়া আছি। আর কি তোকে আর বলব ভাই, বলতেও হেবি লজ্জা লাগছে, পেনাল্টিটা মিস হয়ে যাওয়ার পর, ওদিকে লালার দোকানের সামনে, বুলটির দাদা রাজাদা আর গৌতমরা কি অসভ্যের মতন অঙ্গভঙ্গী আর ফালতু গালিগালজ করছে রে। শেষমেশ, শঙ্করজ্যাঠা আর দাদাভাই গিয়ে দুচার ধমক দিয়ে, রাজাদাদের শান্ত করে এলো। তারপর আমরা বাকীরা বাকী ম্যাচটুকুন দেখলাম ক্লাবে বসে। আর সেই ভর সন্ধ্যেবেলা, গৌতম’টা বেকার মালফাল খেয়ে কি গা-জ্বালানো কাওতালি’রে ভাই। মেসির বাপ মা তুলে কি বাছা বাছা খিস্তি! বাপরে! আরে তোরা শালা ব্রেজিল’কে সাপোর্ট করবি কর, সে তো ছোড়দাদের ফুল গ্রুপটাই করে, তাতে আমাদের কি? আমাদের খিস্তাখিস্তি করবি তা বলে? আর তাও আমাদের করছিস কর, তাই বলে ভাই, মেসি’কে? কি আজিব কথা বলত? কৈ’রে ভাই, আমরা তো নেইমার’কে কিছু বলছিনা। সেও তো সেদিন কাত্তিকের মতন ঝোলাল তোদের ব্রেজিলের ম্যাচ। আমরা না ভাই, কি জানিস, বড় প্লেয়ারদের না, সেই যোগ্য সম্মানটুকুন দিতে জানি। ঠিক বলছিনা রে ভাই?
তবে ভাই, তোকে একটা কথা বলব? মেসির পেনাল্টি মিসটা’য় না, সবচাইতে দুঃখ হয়েছে কিন্তু বাবার। বারবার ঘুরছে ফিরছে আর বলছে, কৃশানু’র পর, ওই মেসির খেলাই যা একটু ভাল লাগত। শেষে কিনা তোদের মেসি’টাই? আমারও কিন্তু হেবি খারাপ লাগছে রে ভাই। মাইরি। সত্যিকারের খারাপ লাগছে রে। আমরা তো আর ওই ফেমাস কৃশানু – বিকাশ জুটি দেখিনি রে ভাই। ইয়উটিউব – ফিউটিউব ফুল সার্চ করে দেখেছি রে ভাই, আন্টু – পান্টু হাজার খবর আছে অনেক, কিন্তু সেরকম ভাল কিছু ফুটবলের ভিডিও কিছু কোথাও নেই রে। বাবা তো আবার অত গুছিয়ে কিছু বলতে পারেনা সব। একদিন বলছিল রে ভাই, সুবলকাকা। শুরু করেছিল নাকি পোর্টে, তারপরে মোহনবাগান আর এইটিফাইভে বোধহয় ইস্টবেঙ্গল। ভেবে দ্যাখ সেই কবেকার প্লেয়ার। সুবলকাকা বলছিল, বাঁ পায়ের ডিফেন্স চেরা থ্রু, ঠিকানা লেখা পাস এক-একটা। শুধু হালকার ওপরে একটু করে, বলের ওপর স্লাইট পা ছোঁয়াতে হবে। গোল। ভাবা যায়না, তাই না রে ভাই?
বাবা বলছিল, একবার নাকি শিল্ডের ফাইনাল খেলায়, মহামেডানে’র এগেন্সটে নাকি, কৃশানু দে’র একটা গোল দেখে বাবার অফিসের বন্ধু, আলমকাকা, নাকি তন্দুরি রুটি আর আমিনিয়া স্পেশাল খাইয়েছিল বাবাদের ফুল ডিপার্টমেন্ট’কে। বল তুই ভাই, তখনকার দিনের মানুষগুলো কেমনি ভাল ছিল বল। নিজের টীম শালা যেখানে ফাইনালে হারল, শুধুমাত্র কৃশানুর গোলের জন্য বাবাদের সবাইকে খাওয়াল। তখন না ভাই, কোন হিন্দু মুসলিম, শিখ ক্রিশ্চান, এইসব বেমক্কা পেঁয়াজি ছিলইনা। যতো হয়েছে না ভাই, সব শালা এখন। এই আমাদের বেহুদা টাইমে। আমাদের শালা লাকটাই ব্যাড লাক। সেদিনকা, আমাদের খবরের কাগজ দেয় না? মেহবুব ভাই। ওই মেহবুব ভাইকে ধরে, রাজাদা’রা কি ক্যালানটাই না ক্যালাল। বেকসুর মারল রে ভাই। কি নাকি মেহবুব ভাইকে চা সিগারেট আনতে দিয়েছিল। রোজার টাইম বলে, মেহবুব নাকি মুখের ওপরে বিন্দাস না বলে দিয়েছে। তুই আমায় একটা বল ভাই, অমনি একটা লোককে, যখন তখন তুই চা আনতে পাঠাতে পারবি? কোন তোর সম্মানে বাঁধবেনা, না কি? কি তোকে বলব ভাই, মাটিতে ফেলে মেরেছে রে ভাই। মেহবুবের সার্ট ফার্ট ছিঁড়ে সে এক কেলেঙ্কারি কেস। যাই বলিস ভাই, রোজার টাইম। আমি তো সবে জানলাম পরশু। ছোট বাপনদের বাড়ীর কাজের মাসী সামিনা, সেদিন ক্লাবে এসে রিটিন কমপ্লেন দিয়ে গেলো।
তবে যাই বলিস ভাই, রাজাদা গৌতমদের না, বহুত কিন্তু ভাও বেড়েছে। বুঝলি ভাই। কথায় কথায় বেকসুর রং। বাবা সুবলকাকারা বলছিল, পাড়ার ক্লাবের মধ্যে এইসব নোংরা পলিটিক্স আগে কিন্তু ছিলনা। তুই নিজে বল ভাই, আমাদের নিজেদের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম, রুলিং-পার্টি-অপজিসন – এইসব আলফাল ছিল কোনোদিন? বল। জানিস ভাই, আমার না, মনে হয় না, আমাদের এই ক্লাবের মধ্যে না, এই মেসি – নেইমার রেষারেষি, তুমি নীল সাদা, আমি হলুদ সবুজ, রাজাদার মেহবুবকে বেকার ক্যালানো, এই সব কিন্তু একটা ফালতু ঝেল। শঙ্করজ্যাঠা হয়ত তত্ত্বকথায়ে বলবে, বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তি। না রে ভাই, তুই হাসিস না। ঠিকই বলছি ভাই, তুই একবারটি ঠাণ্ডা করে ভেবে দ্যাখ। কেন মেসিকে, কেন রোনাল্ডোকে, কেন নেইমার কে, আমরা বাঙালীরা এমনি জান লাগিয়ে সাপোর্ট করি? বল ভাই? তিরিশ বচ্ছর আগেও, বাবারা সুবলকাকারা কেন মারাদোনা পেলে’কে পাগলের মতন সাপোর্ট করত, ভেবে দেখেছিস কি একবারও? আসলে কি না, আমাদের যা নেই, আমরা সেইটাই আঁকড়ে, একটু কিছু সুন্দর সিনারি দেখতে চাই রে ভাই। তাও তো ওই একটু ক’দিনের জন্য মাত্র। তিরিশটা দিন তো অন্তত ভাল কাটবে। বাকী তিনশ তিরিশ যাক না মায়ের ভোগে। তুই জানবি ভাই, মেসি রোনাল্ডো নেইমার, যে কটা’ কে দেখবি, – সব শালা শুনেছি হেবি গরীব ঘরের ছেলে ছিল রে ভাই। হ্যাঁ রে। আমাদের চেয়েও বেশী। ওরা পারলে ভাই, আমরা কেন পারবনা রে? আমাদের কিসের কমি আছে, বাপের পয়সা ছাড়া? সুবলকাকা বলে, কৃশানু ঠিক পারত। সুযোগ পেলেই পারতও। মারডেকা’তে একবার হ্যাট্রিকও করেছিল কৃশানু। আমাদের বাইচুং, সুনীল ছেত্রিও পারত। আমি বলি কি ভাই, হাসিস না ভাই… প্রপার সুযোগ পেলে না, আমাদের ক্লাবের গোলকি নারায়ণদা’ও পারবে। একটু ব্যাকিং করলেই পারবে। সেদিনের সেই ফাইনালের নারায়ণ’দার সেভ’টা দেখেছিলি? পুরো নর্থ ইস্ট থেকে এসে ফুল সাউথ ওয়েস্ট অবধি কাভার করল, তারপরে ছোট্ট টোকা’য়ে বলটা বিলকুল ক্রসবারের ওপরে। আমি শিওর, সবাই পারবে রে ভাই। আমি পারব, তুই পারবি, বাবুসোনা… সবাই পারবে। শুধু ওই রাজাদা’দের মতন সেয়ানাদের না, একটু তফাতে রাখতে হবে। দ্যাখ ভাই, আমার স্ত্রেট কথা। আমার কাছে তো ভাই, ওই মেসি’ও যা, ওই নেইমার’ও তা। বিট খচ্চর হচ্ছে ওই রাজাদাদের গ্রুপটা। আমাদের মধ্যে শুধুশুধু এই মেসি নেইমার রোনাল্ডো নিয়ে খামোখা চুলোচুলি লাগিয়ে দেয়। চল রে ভাই। সাড়ে সাতটা বাজে। আজ কাটি। আজ সন্ধ্যেবেলা ক্লাবে আসিস কিন্তু ভাই। ফুল গ্রুপ একসাথে বসে খেলা দেখব। আর শোন না ভাই, সিগারেট হবে একটা? খাওয়া না ভাই। এত্ত ভাট বকলাম না, গলাটা কেমনি শুকিয়ে গেছে…
মুম্বই
জুন ২০, ২০১৮
Leave a comment