জানিস ভাই # ২

জানিস ভাই, মনটা হঠাৎ খুব ভাল লাগছে রে! হেবি ফ্রেশ। কাল বিকেলে না ঝিম্পি আর ঝিম্পির মা’কে চুরমুর খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে, বুড়োটার জন্য হুট করে একটা ফুল স্কাই ব্লু কালার সার্ট নিয়ে নিলাম। হেবি হ্যান্ডসাম দেখতে। পুরো হাল্কা নীল, গুরু কলারের, হাত কাটা। আর পকেটে না একটা ছোট্ট করে ইংলিসে কি একটা রেড কালারে লিখে দিয়েছে। তবে একটা সাইজ বোধহয় বড় হল মাপে। কিন্তু বুড়ো জেদ ধরে বলে কিনা ওইটাই নাকি পরবে। আমি বললাম, কেন তুমি শুদুমুদু এই ঢোলা মালটা পরবে? দুদিন বাদে তো ঠিক দিদি এসে নিয়ে যাবে শ্যামলদার জন্য। যাই আমি, বদলে এক সাইজ ছোট নিয়ে আসি। আর ভাই, দোকানে তো বিল দিয়েছে। বিলটা তো আছেই সাথে। কাল সকালে গিয়ে বদলে নিয়ে আসব। বলে কিনা, আবার তোদের এই ছ’টাকা ছ’টাকা বারো টাকা বাসভাড়া খরচা করে আসতে যেতে হবেনা। আমি ওতেই চালিয়ে নেব এখন। বোঝ ভাই, কোথায় মলের জামার দাম, আর কোথায় বারো টাকার হিসেব! বলে কিনা, একটু সামান্য ঢোলা’তে আরামই হবে আমার। তারপরে বলে, তুই হাতে করে জামা আনলি? এ জামা আমি শ্যামল কেন, কাউকেই দেবনা। তবে কি বলব ভাই… জানিস ভাই, বাবার গায়ে সার্ট’টা দেখে না, মা মাইরি ঝিম্পিকে জড়িয়ে ধরে সে কি নাকফাক টেনে, ফালতু কান্না! আর বুড়োও দেখি বেকার ঢোক গিলছে বারবার। তারপর, কি একটা বলতে গিয়ে, বলতে না পেরে, দুম করে একটা বিঁড়ি জ্বালিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলো আর মা’ও টিভি’টা অফ করে দিয়ে দেখি দোতলায়ে কাকিমাদের ঘরে ঢুকে গেলো। ছোটছেলে স্বামীর জন্য নতুন জামা এনেছে, এখুনি গোটা পাড়াকে না জানালে চলে?

আর দেখ ভাই… আমার বৌ’টাকে। ঘরে ঢুকে, আয়নার উপরে টিপটা খুলে লাগিয়েই, আমাকে বলে কিনা, অত দামী একটা সার্ট এনে দিলে, তোমার বাবা তোমায় থ্যাঙ্ক ইয়উ বলল না তো? বিলটা’তো ভাঁজ খুলেও দেখলও না দামটা। আমি কি জানিস ভাই, শান্তি চাই’রে আজকাল। তোদের বৌদিকে না এইসব জিনিষ নিয়ে আর বেকার ঘাটাই না। আরে বাবা… বাপের দোকানটাতেই তো বসছি আমি আর দাদা সেই আট বছর হয়ে গেলো। এই তো মাত্র ফাস্ট টাইম কিনলাম বাবার জন্য হাতে ধরে একটা জিনিষ। তার জন্য তোমায় এত কৈফিয়ত… আর তাতে’ই এত ডাঁসা পেয়ারার মতন বাঁকা বাঁকা কথা? আমি না ভাই, জবাব দেইনি প্রথমটায়। তারপরে এড়িয়ে গিয়ে, জবাব দিচ্ছিনা দেখে, বলে কিনা, আমি হলে কিন্তু আগে মাকে দিতাম। ছেলের কাছে সবচেয়ে আগে মা, বাবা আসছে তার পরে।

হ্যাঁ রে ভাই। বৌদিই তোদের ঠিক। সবার আগে মা, বাবা তার পরে। কিন্তু জানিস ভাই, আজকাল যখন ঝিম্পিটার দিকে দেখি না, যখন ইশকুলের বাসে তুলতে যাওয়ার সময়, আমার হাতটা ধরে হাঁটে, রাস্তা পার হয়, আমার না নিজেকে কেমন বাবার মতন মনে হয় রে ভাই। সে একবার বাবার সাথে কলকাতার জানবাজারে মাল কিনতে গেছিলাম। সেই মার্কেটে সেবার আমার ফাস্ট টাইম রে ভাই। লাইফে ফাস্ট টাইম, আমি আর বাবা। একা। কতই বা হবে আমার তখন, ষোল হয়নি তখনও। আমি রাস্তা পার হতে গিয়ে তাল রাখতে পারছিনা দেখে, বাবা ট্রাম লাইনের ওপর আমার হাতটা চেপে ধরল শক্ত করে। মার্কেটে মালটাল কিনে, আমাকে খাওয়াল একটা রাস্তার সস্তা দোকানে। কচুরির সাথে আলুর ঝোল-তরকারী আর লঙ্কার আচার। ভাই, সেই প্রথম পনের বছর বয়েসে জানবাজারের গলিতে শিখলাম, এইসব ভাজা-টাজা খেয়ে না, সাথে সাথে জলটল কিছু খেতে হয়না। হজমের ওতে গড়বড় হতে পারে। ভাই এই সবই তো শিক্ষা রে ভাই। এই ভাবেই শিখলাম রে সব।

হ্যাঁ রে, মানছি রে ভাই, মা আমাদের ভালবেসেছে। সারাজীবনটা নিঃস্বার্থ ভালবেসেছে। আজও ভীষণ ভালবাসে। সে তো দোকান থেকে আমি বা দাদা ঘরে ঢুকলেই, মায়ের মুখের ভাবটা দেখলেই বুঝি। কিন্তু ভাই, এখন দোকানের সামনে দিয়ে ঝিম্পিকে খেলতে দেখে বুঝি, বাবাদের মুখে ওই ভালবাসার ভাব না প্রকাশ করতে গেলে না, অনেক খাটতে হবে। ও বুঝি কেবল সিনেমার বাবার মুখেই দেখা যায়। হ্যাঁ রে ভাই… মানি। মানি এই পৃথিবীটা তে আমাদের নিয়েই এসেছে মা। কিন্তু ভাই, এটা ভুললে কি চলবে রে, আমার আর দাদার কাছে জানবাজারের পৃথিবীটা কিন্তু নিয়ে এসেছে বাবা। হ্যাঁ রে, মানছি ভাই, এমনও দিন গেছে আমাদের। মা নিজে উপোষ দিয়েছে, ফুল খাবারটা না সাজিয়ে দিয়ে দিয়েছে দাদাকে আর আমাকে। কিন্তু ভাই খাবারের কদর করতে শেখাল কিন্তু বাবা। সজনে ডাঁটা থেকে চারা মাছের মাথা, চিবিয়ে কি করে ছিবড়ে করে ফেলতে হয় – বাবার থেকেই তো জানলাম রে ভাই। জানিস ভাই, একবার গোলপোস্টে লেগে দাদার মাথা ফেটে সে কি রক্তারক্তি কাণ্ড। আমাদের ওই ভাঁটার মাঠে। মা তো তার পরদিন কিছুতেই দেবেনা যেতে দাদাকে ফুটবল খেলতে। বাবা দোকান থেকে এসে মায়ের ওপর সেকি চোটপাট রে ভাই। দাদার কপালের ব্যান্ডেজটা একটানে খুলে ফেলে দিয়ে বলে কিনা, যা খেলতে যা। আজ আর ব্যাকে খেলিস না। ওপরে খেলিস, দুটো গোল মেরে আসিস। বল ভাই, মাটিতে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নেবে হয়ত মা। কিন্তু একবার পড়ে গেলে ভাই, উঠতে শেখাবে কে? ভাই দায়িত্ব আর দায়িত্বজ্ঞানের তো সূক্ষ্ম ফারাক তো থাকবেই না রে!

 

ভাই, বাবার না ভারি পছন্দ হয়েছে রে জামাটা। সকাল থেকে দু দুবার বলল আকাশী নাকি খুব পেয়ারের কালার, অনেকদিনের নাকি সখ ছিল। আর দাদাকে নাকি বলেছে, নস্যি নেওয়া ছেড়ে দেবে, যদি নতুন জামাটাতে দাগফাগ লেগে যায়! আর আমার না আজ খুব ভাল লাগছে রে ভাই। তোকে বললাম না? বাবা থ্যাঙ্ক ইয়উ না বললে কি হবে, আমিই না হয় ডেকে বলে দেব একদিন!

 

মুম্বই ১৮ জুন ২০১৮

4 responses to “জানিস ভাই # ২”

  1. Osadharon kabibar – continue like this. ⚽⚽🎻

    Liked by 1 person

  2. Nilanjan Dasgupta Avatar
    Nilanjan Dasgupta

    অসাধারণ লেখা। মনে হচ্ছে কলকাতার কোনো একটা পাবলিক বাসে,ধর 45 নম্বর বাসে গড়িয়া থেকে উঠেছি গন্তব্য উল্টোডাঙ্গা অনেকটা পথ বসেছি কাটা সিটের ঠিক পেছনে আর কাটা সিটে রয়েছে তোর লেখার নায়ক পাশে বসা তার বন্ধু – এই ঘটনাটার বর্ণনা একদম কাছে বসে শুনছি। নায়কের পরনে ধর্মতলার ফুটপাথের সস্তা t shirt যার বুকে হয়তো লেখা “I am the boss”বা একটা খুলির ছবি পেছন থেকে আগুন বেরোচ্ছে আর সাথে আটো সাটো stone wash pant.
    এখন আর এমন চরিত্রর সাথে দেখা হয়না কারণ এখন যে আমি uber চড়ি!!

    Like

  3. Daroon laglo….aro lekho…have no words to express….aro lekhar apekhai roilam…

    Like

  4. Chiradeep Mitra Avatar
    Chiradeep Mitra

    Mon bhorey gelo….very nostalgic….onek kotha money porey gelo!!!!!!

    Like

Leave a comment