টু-ফুঁ

আজ প্রায় দিনচারেক হতে চলল, কথাটা বেশ অনেকবার শুনেও ঠিকমতন আয়ত্ত করে উঠতে পারেনি বেস্পতি। আসলে রেশমিদিদির ওই ফিসফিস করে বলা কথাগুলো বুঝেই উঠতে পারেনি বেচারা, ঠিক কি বলছে? তবে এই বিড়বিড় করে মন্তর পড়ার ব্যাপারটা যে কেবলমাত্র তিনতলার ছাদের বাগানে শালিখ পাখিগুলো ভিড় করলেই হয়, সে বিষয়টা কিন্তু বেস্পতি বুঝে নিয়েছিল শুক্কুরবারেই। অচ্যুতকাকা যখন তাকে এ’বাড়ীতে গত বুধবার ছেড়ে দিয়ে যায় তখন তো সবেমাত্তর দুপুর। সকাল থেকে কিছুটি মাত্র পেটে দেওয়া হয়ে ওঠেনি, একগাল মুড়ি ছাড়া। তাও সে মুড়ি, কাকিমা একটা প্লাস্টিকের  ব্যাগে দিয়ে দিয়েছিল সেই কোন ভোরবেলাতে। ট্রেন ধরবার আগে। তারপর হুরমুড়িয়ে বালিগঞ্জ ইস্টেশনে নামার সময় ভিড়ের মধ্যে মুড়ির ওই প্লাস্টিক ব্যাগটা ফেটেফুটে সে এক একাকার কাণ্ড। অমন যত্ন করে বাঁচিয়ে আনা কাকিমার মুড়িটুকুন কুকুরের পেটে যাচ্ছে দেখে বেস্পতির মনে হয়েছিল ইস্টেশন থেকে কুড়িয়েই নেয় বুঝি মুড়িটা। ভিড়ের ভেতর অচ্যুতকাকা তার হাতটা ধরে একটা হ্যাঁচকা দিতে শেষমেশ আর সবটা কুড়িয়ে উঠতে পারেনি। তবু সেখান থেকেই একমুঠ খানেক বাঁচিয়ে মুখে পুরতে পেরেছিল বেস্পতি। 

শুক্কুরবার প্রথমবারের জন্য রেশমিদিদি বেস্পতি’র সাথে কথা বলল। তাও কথা তেমন কিছু নয়। এই এটা’সেটা এগিয়ে দেওয়ার ইশারা। তেতলার ছাদে খেলছিল রেশমিদিদি। খুব মনোযোগ দিয়ে একটা অবিকল মেমের মতন দেখতে পুতুল নিয়ে। সে পুতুলের সাথে আবার একটা সুন্দর মতন গোলাপি রঙের চিরুনি। দুটো নীল ক্লিপ। আর ওই একটা ক্লিপে বেস্পতি একটু হাত দিতেই ভ্যা করে কেঁদে ফেলেছিল রেশমিদিদি। আর সে কান্নাকাটি শুনেই কিনা জানেনা, সিঁড়ি দিয়ে হড়বড় করে উঠে এলো রেশমিদিদির পিসীটা। খুব দজ্জাল লোক, এরই মধ্যে দু-দুবার কান পেঁচিয়ে দিয়েছে বেস্পতির। পিয়ানোয়ে হাত দিয়েছিল বলে। কিন্তু রেশমিদিদি মুহূর্তে কান্না বন্ধ করে দিল আর ঠোঁটদুটো হাল্কা ফাঁক করে, ডানহাতের দুটো আঙ্গুল নিয়ে ঠোঁটের ওপর রেখে বিড়বিড় করতে বলতে শুরু করল কি একটা। যেন অচ্যুত কাকার মতন এখুনি বিড়ি টানতে শুরু করবে! ঘাড় ঘুড়িয়ে বেস্পতি দেখে, ওই অশ্বত্থ গাছটায়ে বসেছে একঝাঁক শালিখপাখি, আর তার মধ্যে থেকেই দুখানা বুঝি ছিটকে চলে এসেছে রেশমিদিদিদের ছাদে। ওই শালিখগুলোর জন্যই আজ পিসীটার হাত থেকে বেঁচে গেলো বেস্পতি। 

এরপর মাঝে তিনমাস কেটে গিয়েছে। অচ্যুতকাকা এসে টাকা বুঝে নিয়ে গেছে মাসের পয়লা। কাজে মনও বসে গিয়েছে বেস্পতির। কাজ খুব ভারি কিছু নয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে চারটে ঘরের বিছানা তোলা, পিসীটার হাতে হাতে একটু জলখাবার দেওয়া, তারপর সিঁড়িটা মুছে ওই জলটুকুন ছাদের গাছের গোঁড়ায় ঢালা। রেশমি দিদির সাথে ভাব ভালবাসা মন্দ হয়নি বেস্পতির। ডাক্তারি সেট, লুডো, খেলনা বাটি – সবই ধরতে পারে সে, কেবলমাত্র ওই মেম-পুতুলটা ছাড়া। ওইটেতে বেস্পতির হাত পড়লেই, বেমক্কা খেপে যাবে রেশমিদিদি, আর তারপরে তাকে যাচ্ছেতাই গালমন্দ করবে ওই পিসীটা। তবে রেশমিদিদির থেকে শুনে শুনে থেকে আরও একটা মজার ব্যাপার শিখে নিয়েছে বেস্পতি। জোড়া-শালিখ এলেই, ডানহাতের দুটো আঙ্গুল ঠোঁটের ওপর নিয়ে ফিসফিস করে বলতে হবে, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ… মানে যতক্ষণ না পাখি দুটো উড়ে যাচ্ছে, ততক্ষণ একটানা। রেশমিদিদিও ঠিক তাই করে কিনা। “টু ফর জয়” এর বদলে, বেস্পতির টু-ফুঁ শুনে খুব ফুলে-ফুলে হাসতে থাকে রেশমিদিদি। অনেক পরখ করে বুঝে দেখে নিয়েছে বেস্পতি। জোড়াশালিখ দেখে ফিসফিস করে টানা টু-ফুঁ, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ… বলে যেতে পারলে দিনটা তার বেশ ভাল যায়। রেশমিদিদি বেস্পতিকে সব খেলায় নেয়, আর সব থেকে মজার কথা, পিসীটাও ঝামেলা করেনা খুব একটা। 

আজ দিনটা ভাল নয়। খুব মেঘলা। এদিকে মাসপয়লা হয়ে গেলো, এখনও দেশ থেকে এসে উঠতে পারলনা অচ্যুতকাকা। গেলবার কিন্তু কিন্তু করে বলেছিল, বেস্পতির মা’র শরীরটা নাকি একেবারেই ঠিক নেই। কথায় কথায় নাকি সব বমি হয়ে যায় মায়ের। রেশমিদিদির জ্যাঠাবাবু দুটো ট্যাবলেট হাতে দিয়ে অচ্যুতকাকাকে বলছিল, মা’কে খুব করে মিছ্রির জল খাওয়াতে বারে – বারে।। আজ সকাল থেকে তো রেশমিদিদিও নেই বাড়ীতে। কোন্নগর না কোথায় যেন গিয়েছে তাদের মামার বাড়ীতে। মেমপুতুলটা ফেলেই গিয়েছে রেশমিদিদি। ইচ্ছে করলেই বেস্পতি ওটা নিয়ে খেলতে পারে। ইচ্ছে করলেই গোলাপি চিরুনিটা দিয়ে আঁচড়ে দিতে পারে মেম’টার চুল। কিন্তু মা’র কথা মনে পড়ছে কেবল। 

বৈঠকখানা ঘরে ফোন এসেছিল একটা। পিসীটা ফোনে কথা বলে, বেস্পতিকে বলল, জামাকাপড় একটুকুন গুছিয়ে নিতে। অচ্যুতকাকা নাকি নিতে আসবে বেস্পতিকে। কে জানে মা’র বুঝি কিছু হল! জামা না গুছিয়ে একছুটে ছাদে চলে এলো বেস্পতি। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলতে লাগল –  টু-ফুঁ, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ, টু-ফুঁ…। বড্ড ভাবনা হচ্ছে মা’র জন্য আজ। 

Leave a comment